১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৬:৪৩ পিএম

সত্তর, আশি, নব্বই দশকে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিবি) চলতো কীভাবে? বিদেশ সফরের খরচ বহন করতো কে? বিসিবিতে টাকার গাছের চারাটা কারা লাগিয়েছেন? বর্তমান প্রজন্মকে তা জানানো দরকার।
আর্থিক টানাপোড়েনে থাকা স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম দুই দশকে ঢাকা ক্রিকেট লিগে ম্যাচ বল পর্যন্ত কেনার সামর্থ ছিল না বিসিসিবির। লিগের ম্যাচে আম্পায়ার-স্কোরারদের লাঞ্চটা পর্যন্ত দিতে পারতো না বিসিসিবি। দুই দল ভাগ করে খাওয়াতো আম্পায়ার-স্কোরারদের। ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে টিকিট বিক্রি থেকে আয় দিয়ে সারা বছর চলতো বিসিসিবির কার্যক্রম। ঈদ এলে বিসিসিবির কর্মচারিদের বোনাসের যোগানটা আসতো বিসিসিবির কার্যনির্বাহী সদস্যদের চাঁদায়। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বিদেশ সফরের খরচ নির্বাহে হাত পাততে হতো জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) দিকে। ১৯৭৯ সালে আইসিসি ট্রফিতে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহনে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বেজ ক্যাম্পটা হয়েছে নৌবাহিনীর সদর দফতরে, তা তৎকালীন বিসিবি সভাপতি কমোডোর মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে। বিসিসিবিতে সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি হিসেবে ৭ বছর ছিলেন কে জেড ইসলাম। ওনার অটোবায়োগ্রাফি 'ক্রিকেটের নির্মাণ' লিখতে যেয়ে জেনেছি অনেক অজানা তথ্য। নিজ হাতে বাংলাদেশ বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি লিখে বিশেষ ডিসকাউন্ট অফারে বাংলাদেশ দলের জন্য টিকিটের বন্দোবস্ত করেছেন। এই হ্রাসকৃত মূল্যে পুরো টিমের টিকিটের টাকাটাও নিজ দিয়েছেন ! যে লোকটি নিজের প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ইন্টারন্যাশনাল-এর স্পন্সরে দেশব্যাপী স্কুল ক্রিকেট প্রবর্তন করেছেন, স্কুল ক্রিকেটের সমুদয় খরচ টানা ১৬ বছর বহন করেছেন, ক্রিকেট দলের বিদেশ সফরের খরচটা তিনি বহন করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক।
আর্থিক টানাপোড়েনে বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে স্বপ্নের পরিধিটা বৈশ্বিক আসর পর্যন্ত যাবে, সত্তর-আশি দশকে কল্পচোখেও কী কেউ দেখেছেন? টিনের বালতিতে ওয়াসার সাপ্লাই পানিতে লেবু, গুড় মিশিয়ে সরবত বানিয়ে প্লাস্টিকের গ্লাসে করে ড্রিকংস ব্রেকের সময়ে তা পান করে মহাতৃপ্ত ক্রিকেটাররাও অতোটা স্বপ্ন দেখেননি। দেখবেন কী করে? আউটার স্টেডিয়ামে কংক্রীটের পিচে পুরোনো ক্রিকেট বল আকৃতি পরিবর্তনের পরও সেলাই দিয়ে অনুশীলন করে, কিংবা ম্যাচে একটি ম্যাচ ব্যাট আর ২ জোড়া মাত্র প্যাড সম্বল করে ক্রিকেট মাঠে ক্লাবকে জড়ো করা ছিল যাদের জন্য কঠিন কাজ, আজ তারা দেখছেন ক্লাবগুলোর বিত্ত-বৈভব।
কীভাবে ক্রিকেটকে ঘিরে স্বপ্নের পরিধিটা ছুঁয়েছে আকাশ? শৈশব-তারুণ্যে ক্রিকেট সমর্থক হিসেবে মাঠে নিয়মিত হাজিরা দেয়ার পর তিন দশকের ক্রীড়া সাংবাদিকতা জীবনে ক্রিকেটের বিবর্তনের পুরো গল্পটাই বলতে পারব। বিবর্তনের গল্পে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতে হবে যাদেরকে, তাদের অগ্রভাগে থাকবেন রাইসউদ্দিন আহমেদ-রেজা-ই-করিম জুটি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের খেলার দরজাটা খুলে দিয়েছেন তাঁরাই। আইসিসির সহযোগী সদস্যপদটা আদায় করে নিয়েছেন তারাই। এর পর আসবেন আমিনুল হক মনি নামের এক মেধাবি সংগঠক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে ক্রিকেট অন্তপ্রাণ এই মানুষটির আইডিয়ায় প্রবর্তিত হয়েছে সার্ক ক্রিকেট। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা 'এ' দলের সঙ্গে লড়াই করে নিজেদের আত্মবিশ্বাস নিয়েছে বাড়িয়ে। ১৯৯৭ সালের মার্চ-এপ্রিলে আইসিসি ট্রফির আসর বসবে মালয়েশিয়ায়, তখন থাকবে ভরা বর্ষা মৌসুম। খেলাগুলো হবে অ্যাস্ট্রো টাফে। তা জেনে বিসিসিবির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক আমদানী করেছিলেন বেশ কিছু অ্যাস্ট্রো টার্ফ। ন্যাচারাল পিচের বদলে এই অ্যাস্ট্রো টার্ফে প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ আয়োজন করেছিলেন। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফির পূর্ব প্র্রস্তুতিটা দেশের মাটিতেই নিতে পেরেছে ক্রিকেটাররা, তাঁর এই পরিকল্পনায়।
১৯৯৭ সালের নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হলে বিসিসিবি সভাপতি পদে সাবের হোসেন চৌধুরীকে নিযুক্ত করাটাও ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠানোর টার্নিং পয়েন্ট। জাতীয় দলের ক্রিকেট কোচের খরচ নির্বাহ করার সঙ্গতি ছিল না তৎকালীন বিসিসিবির। পরিস্থিতির মুখে এনএসসির শরনাপন্ন হয়ে মাসে ৫ হাজার মার্কিন ডলার বেতনে ক্যারিবিয়ান লিজেন্ডারি স্যার গর্ডন গ্রীনিজকে দিয়েছিলেন ২ বছরের জন্য নিয়োগ। দায়িত্ব নিয়েই গর্ডন গ্রীনিজ ক্রিকেটারদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন-
'উপমহাদেশের তিনটি দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা আইসিসির পূর্ণ সদস্য। এই তিনটি দেশই বিশ্বকাপের ট্রফি জিতেছে। তাহলে বাংলাদেশ কেনো আইসিসি ট্রফি জিততে পারবে না ?'
এই কথাটি ক্রিকেটারদের মাথায় ভালভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ছোঁয়াতেই বদলে গেছে ক্রিকেট দল।
১৯৯৪ সালে কেনিয়ায় অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফিতে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে বাংলাদেশের। প্রথম রাউন্ডে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে হেরে রানার্স আপ হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে বাংলাদেশ পেয়েছে কঠিন দুই প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডস-কেনিয়া। নেদারল্যান্ডসের কাছে ৪৭ রানে এবং কেনিয়ার কাছে ১৩ রানে হেরে বাংলাদেশ দলের বিদায় আইসিসি ট্রফির পরবর্তী আসরে দিয়েছে সতর্কবার্তা।
১৯৯৭ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ওই তিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিয়েছে মধুর প্রতিশোধ। সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ১১০ রানে, নেদারল্যান্ডসকে ৩ উইকেটে এবং কেনিয়াকে ২ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশ জিতেছে আইসিসি ট্রফি। মালয়েশিয়ার কুয়ালামপুরের কিলাত ক্লাবে বিজয় উল্লাসে ১৯৯৯ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে।
১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিল আইসিসি ট্রফি জয়টাই বাংলাদেশের ক্রিকেটের বাঁক বদলের গল্প রচনা করেছে । বিসিসিবি থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) নামকরন করে দেশের ক্রিকেটকে অন্য উচ্চতায় তুলতে চেয়েছেন সাবের হোসেন চৌধুরী। আইসিসি ট্রফি জয়ের পর আকাশপথে ক্রিকেটারদের ভ্রমন সুবিধা ইকোনমি ক্লাস থেকে বিজনেস ক্লাসে উন্নীত করেছেন তিনি। ক্রিকেটারদের পে রোলে এনেছেন তিনি।
নব্বই দশকে এশিয়া কাপ খেলে পেপসি থেকে যেখানে বিসিসিবি পেতো ২৫ হাজার মার্কিন ডলার, আইসিসি ট্রফি জয়ের পর সেই অঙ্ককে চারগুনে উন্নীত করেছেন সাবের হোসেন চৌধুরী। ২০০৪ সাল থেকে এশিয়া কাপের অ্যাপিয়ারেন্স মানি'র অঙ্ক ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার সমান পাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।
আইসিসি ট্রফি জয়ের ২৯তম বর্ষপূর্তি আজ। বিসিবিতে নেই সেই ট্রফি জয়ী দলের অধিনায়ক আকরাম খান। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তাঁর হার না মানা ৬৮ রানের ইনিংসটাই বাংলাদেশের ক্রিকেটে বাঁক বদলের গল্পের প্রথম অধ্যায়। 'এক ধাপ পেরুলেই বিশ্বকাপ'-স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে অবতীর্ন হওয়ার আগে একটি দৈনিকের এমন শিরোনাম দেখে শিহরিত হয়েছিলাম। ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন পেয়ে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে খালেদ মাসুদ পাইলটের ৯৬ বলে ৭০ রানের ইনিংসের কল্যানে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৭২ রানে জয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ দল নিশ্চিত করেছে বিশ্বকাপের টিকিট। অবশিষ্ট ছিল আইসিসি ট্রফির শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন। রিজার্ভ-ডে-তে গড়ানো ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে যখন টার্গেট দাঁড়ায় ২৫ ওভারে ১৬৬, সেই ফাইনালে জয়ের আশা বাংলাদেশ সমর্থকদের ক'জনইবা করেছে? টেল এন্ডার রফিককে ওপেনিংয়ে নামিয়ে গর্ডন গ্রীনিজ খেলতে চেয়েছিলেন জুয়া। সেই জুয়ায় জিতেছে বাংলাদেশ। শেষ বলে লেগ বাই এর সুবাদে হাসিবুল হোসেন শান্ত'র দৌঁড়ের সঙ্গে সঙ্গে কিলাত ক্লাব মাঠটা দখল করে উৎসব করেছে প্রবাসীরা। যে উৎসবের ছাঁট ছুটে এসেছে বাংলাদেশে। দিনভর রঙ, কাঁদা ছিটিয়ে, মিস্টি বিতরণ করে অন্য এক উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে রাজধানীতে।
এমন একটা ইতিহাস রচনার পরদিন ছিল বাংলা নববর্ষ। রমনা বটমূলে ইলিশ-পান্থা উৎসব কিংবা ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব ছাপিয়ে জনতার ঢল নেমেছে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে। চাটার্ড ফ্লাইটে কুয়ালামপুর থেকে ঢাকায় ক্রিকেট দলের অবতরণের দৃশ্যটাও কল্পনাতীত। জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টারমার্কে ক্রিকেট দলকে বরণে উপচে পড়েছে জনতা। সেখান থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর পথে ক্রিকেটারদের কীভাবে আনা হয়েছে, বাংলাদেশ বেতার সেই ধারাবিবরনী দিয়েছে। শেষটা ছিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর নাগরিক সম্বর্ধনা। নাগরিক সম্বর্ধনায় ইতিহাস রচনার নায়কদের কাছ থেকে দেখার সে কী আনন্দ। যে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে নগদ অর্থ পুরস্কারে ক্রিকেট দল হয়েছে সম্মানিত। নাগরিক সম্বর্ধনায় কোচ গর্ডন গ্রীনিজ পেয়েছেন বাংলাদেশের অনারারী সিটিজেনশিপ। ওই সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যের একটি লাইন ছিল-'লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান, দিস ভিক্টরি ইজ ফর ইউ।' যা ২৯ বছর পর এখনো কানে বাজে।
রাজনৈতিক মামলায় নাইমুর রহমান দুর্জয় এখন কারাগারে। ওই দলের আর এক ক্রিকেটার বিসিবি সভাপতি পদ হারিয়ে মেলবোর্নে চলে গেছেন। খালেদ মাসুদ পাইলটও বিসিবির অফিস থেকে ভয়ে পালিয়ে গেছেন। ভেঙ্গে যাওয়া বোর্ডের সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ বিসিবি থেকে নির্বাসিত। আইসিসি ট্রফি জয়ী ওই দলের সদস্যদের মধ্যে বিসিবির অন্তবর্তীকালীন কমিটির সদস্য হিসেবে আছেন মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, আতাহার আলী। স্পিন বোলিং কোচ হিসেবে মোহাম্মদ রফিক, আম্পায়ার্স কমিটিতে এনামুল হক মনি, নির্বাচক হিসেবে হাসিবুল হোসেন শান্ত এবং বিসিবির প্যানেল কোচ হিসেবে আছেন সাইফুল ইসলাম।
দেখতে দেখতে কেটে গেছে ২৯টি বছর। তবে আজ থেকে ২৯ বছর আগে বাংলাদেশের ক্রিকেটের বাঁক বদলের গল্পটা যারা লিখেছেন, তাদেরকে কি এই প্রজন্মের কাছে ঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কিংবা ক্রীড়া মন্ত্রানালয়?
No posts available.
২০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৩ পিএম
২০ এপ্রিল ২০২৬, ৮:২৭ পিএম
২০ এপ্রিল ২০২৬, ৮:০৬ পিএম

ক্রিকেটে যে কোনো পেসারের বড় শত্রু চোট। ক্যারিয়ারের উড়ন্ত অবস্থায় হঠাৎ ইনজুরিতে পেসারদের খেই হারানোর নজির আছে অনেক। তবে এই অমোঘ সত্য মেনে নিয়েই গতিময় বোলিং চালিয়ে নিচ্ছেন নাহিদ রানা।
সন্দেহাতীতভাবেই বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গতিময় বোলার নাহিদ। গত কয়েক বছর ধরে তিন সংস্করণেই বল হাতে গতির ঝড় তুলছেন তরুণ এই পেসার। যার আগুনে সবশেষ ভস্মীভূত হয়েছে নিউ জিল্যান্ডের ব্যাটিং।
সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ১০ ওভারে ৫৯টি ডেলিভারি ১৪০ কিমি প্রতি ঘণ্টার চেয়ে বেশি বেগে করেছেন নাহিদ। সোমবার তার আগুনঝরা এই বোলিংয়ের জবাব দিতে না পেরে ৩২ রানে ৫ উইকেট দিয়েছে কিউইরা।
এর আগে গত মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৪ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন নাহিদ। এর বাইরে টেস্ট আর টি-টোয়েন্টিতেও প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের মনে কাঁপন ধরানোর কাজটি নিয়মিতই করছেন ২৩ বছর বয়সী পেসার।
তবে যতোই ভালো করছেন নাহিদ, ততোই উঁকি দিচ্ছে আরেক শঙ্কা- ইনজুরির চোখরাঙানি। প্রশ্ন উঠছে চোট থেকে বেঁচে থাকতে যথাযথ পূর্ব সতর্কতা নিচ্ছেন তো নাহিদ?
কারণ ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে গতিময় বোলিং নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তালহা জুবায়েরও। কিন্তু চোটের কারণে লম্বা হয়নি তার ক্যারিয়ার। দেশসেরা অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাও শুরুতে করতেন এক্সপ্রেস বোলিং। কিন্তু চোটের কারণে পরে হয়ে যান মিডিয়াম পেসার।
এছাড়া নানা সময়ে চোটের কারণে ভুগতে হয়েছে নাজমুল হোসেন, রুবেল হোসেন থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান, শরিফুল ইসলাম, তানজিম হাসান সাকিবদের।
পেসারদের জন্য যে চোটে পড়া অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়, তা ভালোভাবেই জানা নাহিদের। তার মতে, যুদ্ধ করতে নামলে গুলি খেতেই হবে। দ্বিতীয় ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এই কথাই বলেন নাহিদ।
“অবশ্যই ইনজুরি কখনও বলে-কয়ে আসে না। আর আপনি যদি যুদ্ধে নামেন, তবে গুলি তো আপনার গায়ে লাগবেই। সেই রকম যদি ক্রিকেট খেলেন তো ইনজুরি আসবেই, ইনজুরিতে পড়বেন এটা স্বাভাবিক।”
পাশাপাশি ইনজুরি থেকে বেঁচে থাকার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তরুণ পেসার।
“ফিটনেস পরিচর্যারর বিষয়টা... বিসিবিতে যারা ফিজিও আছেন বা ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট দেখার দায়িত্বে যারা আছেন, তারা অবশ্যই দেখেন যে কোন ম্যাচ বা কয়টা ম্যাচ খেলব। তারাই সার্বিক দিক দেখভাল করেন আমাদের পেস বোলারদের।”

শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডার দাসুন শানাকাকে এক মৌসুমের জন্য পিএসএল থেকে নিষিদ্ধ করেছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)।
পিসিবি জানিয়েছে, লাহোর কালান্দার্সের সাথে চুক্তি থাকা সত্ত্বেও পিএসএল থেকে নাম প্রত্যাহার করে আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসে যোগ দেওয়ায় চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছেন শানাকা।
সোমবার এক বিবৃতিতে পিসিবি আরও জানায়, ‘পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার’ পর শানাকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বোর্ডের মতে, শানাকা একতরফাভাবে নাম প্রত্যাহার করেছেন, যা খেলোয়াড় নিবন্ধন শর্ত এবং ত্রিপক্ষীয় চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। এর ফলে তিনি ২০২৭ সালের পিএসএল-এ অংশ নিতে পারবেন না।
শানাকার আগে জিম্বাবুয়ের ফাস্ট বোলার ব্লেসিং মুজারাবানিকেও দুই মৌসুমের জন্য নিষিদ্ধ করে পিসিবি। মুজারাবানি ইসলামাবাদ ইউনাইটেডের সাথে চুক্তি বাতিল করে কলকাতা নাইট রাইডার্সে যোগ দিয়েছিলেন। পিএসএল থেকে নাম প্রত্যাহারের কারণে কোনো খেলোয়াড়ের ওপর এটিই এখন পর্যন্ত পিসিবির দেওয়া সবচেয়ে কঠোর শাস্তি।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটে রোমাঞ্চকর বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম নাহিদ রানার বোলিং। টানা গতিময় বোলিং করে যে কোনো দলকে ভড়কে দেওয়ার কাজটি নিয়মিতভাবেই করছেন তরুণ এই পেসার। আর এটি ধারাবাহিকভাবে করার পেছনে রয়েছে খেলাবিহীন ফাঁকা সময়ে করা পরিশ্রম।
মিরপুরে সোমবার নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডে ১০ ওভারে এক মেডেনসহ মাত্র ৩২ রানে ৫ উইকেট নিয়েছেন নাহিদ রানা। তার আগুনঝরা বোলিংয়ে অনায়াস জয়ে সিরিজে সমতা ফিরিয়েছে বাংলাদেশ। স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচ সেরার পুরস্কার জিতেছেন ২৩ বছর বয়সী পেসার।
গত মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৪ রানে ৫ উইকেট নেন নাহিদ। সেদিনের মতো নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষেও গতির ঝড় তোলেন তিনি। ম্যাচে নিজের প্রথম বল থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত টানা ১৪০ কি.মি. প্রতি ঘণ্টা গতিবেগের ওপরে বোলিং করেন বাংলাদেশের তরুণ পেসার।
অথচ বেশ কিছু দিন ধরেই ঢাকার তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। সোমবার ম্যাচ চলাকালীন সময়েও তাপমাত্রা ছিল ৩৫-৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতার কারণে গরম অনুভূত হয় আরও বেশি।
এর মাঝেও নিউ জিল্যান্ডকে ভড়কে দিয়ে ১৯টি ডেলিভারি ১৪৫ কি.মি. প্রতি ঘণ্টার বেশি বেগে করেন নাহিদ। নিজের ১০ ওভারের মধ্যে ৫৯টি বৈধ ডেলিভারিই তিনি করেন ১৪০ কি.মি. প্রতি ঘণ্টার বেশি গতিতে।
নাহিদের এমন ধারাবাহিক গতিময় বোলিং ভড়কে দিয়েছে নিউ জিল্যান্ডকেও। ম্যাচ শেষে যা স্বীকার করেছেন ৮৩ রান করা কিউই ওপেনার নিক কেলি। আর এর পেছনে ফিটনেস ধরে রাখার কৃতিত্ব দিয়েছেন নাহিদ।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তরুণ এই পেসার গতি ধরে রাখার জন্য ফিটনেস নিয়ে কাজ করার বিস্তারিত ধারণা দেন।
“আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ ফিট রেখেছেন। ফিটনেস নিয়ে যে জিনিসটা, সেটা আমি আমার প্র্যাকটিসের বাইরে কিংবা যখন প্র্যাকটিস চলে তখন ফিটনেস ট্রেইনারের সঙ্গে কাজ করি।”
“তাদের সঙ্গে কথা বলি যে, কীভাবে নিজের ফিটনেসটা উন্নত করা যায় কিংবা আরও বাড়ানো যায় যাতে আমার ম্যাচের সময় মাঠের মধ্যে ভালো অনুভূতি হয় আমি বোলিং করছি, কখনও টায়ার্ড না হই।”
আর এগুলো করার জন্য খেলা না থাকা ফাঁকা সময়গুলো বেছে নেন নাহিদ।
“এই জিনিসগুলোর জন্য ফাঁকা সময়ে যে জিনিসগুলো করা লাগে; জিমে বলেন বা রানিং বলেন কিংবা নিজের পরিচর্যা করা- এই জিনিসগুলো খেলার বাইরে ফাঁকা সময়েও ভালো করার চেষ্টা করি।”
তবে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই খরুচে ছিলেন নাহিদ। ১০ ওভারে ৬৫ রান দিয়ে নিতে পেরেছিলেন স্রেফ ১ উইকেট। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে পরের ম্যাচেই জেতালেন দলকে।
এই বিষয়ে নাহিদ বললেন, সব দিন সবার সমান যায় না।
“প্রত্যেক দিন, প্রত্যেক ম্যাচ একজন ক্রিকেটারের জন্য ভালো যায় না। আগের ম্যাচ আমার জন্য হয়তো ভালো দিন ছিল না। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছি, কাজ হয়নি। এই ম্যাচেও সেটা করার চেষ্টা করেছি যা যথাযথভাবে হয়েছে।”

প্রথম ম্যাচে ব্যাটারদের ব্যর্থতায় হেরে গেলেও, দ্বিতীয় ওয়ানডেতে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ দল। ফলে সিরিজ এখন সমতায়। শেষ ম্যাচ জিততে ট্রফি নিজেদের করে নিতে আত্মবিশ্বাসী নিউ জিল্যান্ড। আর নাহিদ রানা বললেন, খেলা হবে মাঠেই।
মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সোমবারের ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন নাহিদ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তুমুল গতিময় বোলিংয়ে ১০ ওভারে এক মেডেনসহ মাত্র ৩২ রান খরচ করে তিনি নিয়েছেন ৫ উইকেট।
নাহিদের গতির আগুনে পুড়ে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় নিউ জিল্যান্ড। পরে তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্তর ফিফটিতে অনায়াস জয়ই পায় বাংলাদেশ। যার ফলে সিরিজ এখন ১-১ ব্যবধানে সমতায়।
চট্টগ্রামে আগামী বৃহস্পতিবার সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে লড়বে দুই দল। এর আগে দ্বিতীয় ম্যাচ শেষে নিউ জিল্যান্ডের ওপেনার নিক কেলি বলেছেন, প্রথম ম্যাচ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ও দ্বিতীয় ম্যাচের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সিরিজ জিততে চান তারা।
“এই তো দুই দিন আগে আমরা ভালো পারফর্ম করে প্রথম ম্যাচটি জিতেছি। তো এখান থেকে আমরা শিক্ষা নেবো। কাগজে-কলমে এটি খুব বাজে পরাজয়। তবে আমরা যদি শেষ দিকে ৪০-৫০ রান বেশি করতে পারতাম, তাহলে তাদের জিততে আরও সময় লাগত। তো হ্যাঁ, বিশ্রাম নিয়ে আমরা সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচের জন্য তৈরি থাকব।”
পরে সংবাদ সম্মেলনে আসা নাহিদকে জানানো হয় কেলির মন্তব্যের ব্যাপারে। প্রতি উত্তরে তেমন কিছু না বলে নাহিদ জানান, খেলা হবে মাঠেই!
“নিউ জিল্যান্ড সিরিজ জেতার কথা বলেছে... অবশ্যই তারা ভালো দল। আসলে মুখে ক্রিকেট খেলা হয় না। মাঠে যে ভালো খেলবে, সেই জিতবে। তো পরের ম্যাচ আমরা ইনশাআল্লাহ্ চেষ্টা করব।”
“ঘরের মাঠে আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব সুবিধা নেওয়ার। তবে যে মাঠে ভালো ক্রিকেট খেলবে এবং ভালো পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করবে, তারাই জিতবে।”

বাংলাদেশ-নিউ জিল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজ ১-১ সমতায়। প্রথম ম্যাচ কিউইদের ২৬ রানে জয়ের পর দ্বিতীয়টি নিজেদের পক্ষে নিয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজরা। সোমবার হোম অব ক্রিকেট মিরপুর শেরেবাংলায় সফরকারীদের ৬ উইকেটে হারিয়ে সমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ।
সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচ রাজধানীতে হলেও তৃতীয় ও শেষটি অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রামের জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে। আগামী বৃহস্পতিবার সিরিজ নির্ধারণী লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে দুদল।
নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচের স্কোয়াডে বাংলাদেশ দলে যুক্ত করা হয়েছে পেসার তানজিম হাসান সাকিবকে। জাতীয় দলের হয়ে সবশেষ ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর একদিনের ম্যাচ খেলেছেন তিনি। স্কোয়াডের বাকি অংশ অপরিবর্তিত রয়েছে।
তৃতীয় ওয়ানডের জন্য বাংলাদেশ দল:
মেহেদী হাসান মিরাজ (অধিনায়ক), সৌম্য সরকার, সাইফ হাসান, তানজিদ হাসান তামিম, নাজমুল হোসেন শান্ত, তাওহিদ হৃদয়, লিটন কুমার দাস, আফিফ হোসেন ধ্রুব, মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন, রিশাদ হোসেন, তানভির ইসলাম, মুস্তাফিজুর রহমান, তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলাম, নাহিদ রানা, তানজিম হাসান সাকিব।