২৯ এপ্রিল ২০২৫, ১০:০২ পিএম
লামিন ইয়ামাল যখন মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্পেনের হয়ে ইউরো জিতলেন, তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল মজার সব ‘মেমে’। যেখানে বলা হত, ইয়ামাল ১৬ বছরে এটা করছেন, আর অন্য ১৬ বছর বয়সীরা তখন ফিফা গেমস খেলেই সময় পার করতে ব্যস্ত। তবে ১৪ বছর বয়সী বৈভব সুরিয়াভানসি যেহেতু উপমহাদেশের একজন, তাই আইপিএলে তার তাক লাগানো ব্যাটিং দেখে মেমেতে চলে আসছে এই বয়সে অন্য বালকদের মার্বেল খেলার গল্প। স্থান, কাল ভেদে এভাবেই একই চিত্রের উদাহারনও বদলে যায়। তবে মিল থাকে একটাই, এই অল্প বয়সেই এমন জেনারেশনাল ট্যালেন্টদের পরিণতবোধ।
এর আগে একটু বয়সের আলোচনায় যাওয়া যাক। উপমহাদেশের ক্রিকেটারেরদের বয়স নিয়ে বেশ আগে থেকেই থেকে যায় একরকম ধোঁয়াশা। কোনটা আসল বয়স, আর কোনটা যে স্রেফ সার্টিফিকেট বয়স, তা নিয়ে পুরো ক্যারিয়ারেই তাদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। যেমন ধরুন সাবেক পাকিস্তান অলরাউন্ডার শহিদ আফ্রিদির কথা। ১৮-তে পা দেওয়ার আগেই সেই সময়ে ওয়ানডে ক্রিকেটের দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড তিনি গড়েন, সেই সময়েই তার আসল বয়স ২২ বা তার চেয়েও বেশি বলে জোর গুঞ্জন।
হাল সময়ের আফগান মহাতারকা রশিদ খান তো আরেক জলন্ত উদাহারন। অফিশিয়ালি সব জায়গায় তার বয়স ২৬ দেখালেও আসল বয়সটা যে প্রায় ৩০ ছুঁইছুঁই বা তার চেয়েও বেশি, সেটা তার ভিন্ন ভিন্ন সাক্ষাৎকারে দেওয়া কথা শুনলেও আন্দাজ করা যায়। এছাড়া উপমহাদেশের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে নির্দিষ্ট বয়সের চেয়ে অনেক বেশি বয়সের খেলোয়াড়দের নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও হয় অহরহ।
আর ঠিক এই কারণেই ভারতের অমিত প্রতিভাবান ব্যাটার সুরিয়াভানসির অফিশিয়াল বয়স ১৪ বছর বলা হলেও তা নিয়ে বেশ আগে থেকেই চলছে আলোচনা। বিশেষ করে আইপিএলে অভিষেকের পর থেকে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে আইপিলের মত তীব্র প্রতিদ্বন্দিতার একটি টুর্নামেন্টে রাজস্থান রয়্যালসের মত একটি দলে তিনি যখন জায়গা পেয়ে যান, অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছিলেন তাতে বেশ। তবে যারা ভারতীয় ক্রিকেটের টুকটাক খোঁজ খবর রাখেন, তারা জানতেন, এমন কিছু হওয়াটাই বরং স্বাভাবিক।
নাহ, ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্স এখানে মূল বিষয় নয়। সেটা সুরিয়াভানসির ক্ষেত্রে এখনও খুব হাইলাইট করার মত জায়গা নয়। তবে যা আলোচ্য বিষয়, তা হল তিনি এই বয়সেই ভারতের অ-১৯ দলে খেলছেন। মাত্র ১২ বছর বয়সেই হয়ে গেছে রঞ্জি অভিষেক। গত জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করেছেন মাত্র ৫৮ বলের সেঞ্চুরি, যা যুব টেস্টের ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম। এসব বলে দেয়, বিশাল স্কোর বা এসবের রেকর্ডের চেয়েও বালক বয়সেই সুরিয়াভানসি পাদপ্রদীপের আলোয় চলে এসেছেন তার পরিণতবোধ এবং আধুনিক ক্রিকেটের ব্যাপক পরিচিত শব্দ ‘ইন্টেন্ট’-এর জন্য। ফরম্যাট যাই হোক, প্রথম বল থেকেই আগ্রাসী ব্যাটিংটা তিনি করতে জানেন ক্লাসিক্যাল ব্যাটিংয়ের সংজ্ঞা ধরে রেখেই।
আর সেই কারণেই গেল বছর আইপিলের মেগা নিলামের সময় মাত্র ১৩ বছর বয়সী সুরিয়াভানসির নাম আসতেই একটা কাড়াকাড়ি লেগে যায়। রীতিমত যুদ্ধ করে তাকে দলে নেয় রাজস্থান। দলটির মেন্টর ও সাবেক ভারত অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড় প্রতিভা চেনা এবং তা ঘষামাজা করার কাজটা করেন বেশ ভালো। তিনি নিলামের আগে সুরিয়াভনসিকে ট্রায়ালে দেখেই বলেছিলেন, এই ছেলের মাঝে অবিশ্বাস্য স্কিল আছে।
তবে রঞ্জিতে, অ-১৯ দলে এবং আইপিএলে খেলার জন্য সুরিয়াভানসির মানসিকভাবে ভীষণ পরিণতবোধ রেখেছে বড় একটা ভূমিকা। তার জন্মের আগে থেকে ক্রিকেট খেলা আন্তর্জাতিক মানের বোলারদের যেভাবে পেটাচ্ছেন প্রথম বল থেকেই, সেটিকে আপনি ‘ঝড়ে বক’ এর মধ্যে চাইলেও ফেলতে পারবেন না। কোন বলটিকে কোথায় মারতে হবে, কোন বোলারকে শুরুতেই আক্রমণ করে চাপে ফেলে দিতে হবে, এই বিষয়গুলো ব্যাটাররা রপ্ত করেন খেলতে খেলতে, অভিজ্ঞতায় রিদ্ধ হয়ে।
তবে আপনি যদি হুট করে এই আইপিএলে সুরিয়াভানসির ব্যাটিং দেখেন, বলতে বাধ্য হবেন এই ছেলে নিশ্চয় কয়েক বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে ফেলেছে। মাথাটা ঠিক সেভাবেই যে কাজ করে তার। সাবেক ভারত ওপেনার ও ধারাভাষ্যকার সঞ্জয় মাঞ্জারেকার যেমন বলেছেন,
“বয়সটা মাত্র ১৪ হলেও সুরিয়াভানসি চিন্তা করে একজন ৩০ বছর বয়সীর মত।”
গুজরাট টাইটান্সের বিপক্ষে ম্যাচের আগেই তাই ভারতীয় ক্রিকেটে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন সুরিয়াভানসি। আইপিএলে নিজের অভিষেক ম্যাচের প্রথম বলেই যে হাঁকিয়েছেন বিশাল এক ছক্কা। তবে আপনি যত বড় প্রতিভাবানই হন না কেন, মাত্র ১৪ বছর বয়সে যখন আপনার মার্বেল বা ইয়ামালদের মত ফিফা গেমস খেলার কথা, তখন আপনাকে আইপিএলের মত অবিশ্বাস্য কঠিন মঞ্চে নামিয়ে দেওয়া যায়… এটা একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি তখনই ভাবতে পারে, যখন আপনি প্রমাণ করতে পারেন অন্যদের চেয়ে নিজের বয়সের তুলনায় ঢের এগিয়ে থাকার সামর্থ্য।
সুরিয়াভানসি নিশ্চয় নেটে এবং অনুশীলনেও রাজস্থানকে এটা বোঝাতে পেরেছিলেন যে, তার ওপর বাজিটা ধরা যায়। প্রথম কয়েক ম্যাচে উড়ন্ত সূচনা পেলেও বড় ইনিংস অবশ্য হচ্ছিল না। সাবেক ভারত ওপেনার বীরেন্দর শেবাগ তাই আশঙ্কা করে বলেও ফেলেছিলেন, এক বছরের ঝলক দেখিয়ে অতীতের অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের মত না আবার হারিয়ে যান সুরিয়াভানসি।
তবে তার মত প্রতিভারা তো প্রতিদিন আসেন না। এই কারণেই অন্যদের সাথে সুরিয়াভানসিদের মেলানো যায় না। শেবাগকে ভুল প্রমাণ করে তাই গুজরাটের বিপক্ষে রান তাড়ায় খেললেন বড় ইনিংস। সেটাও টর্নেডো গতিতে। ৭ চার ও ১১ ছক্কায় মাত্র ৩৮ বলে ১০১ রান করার পথে হয়েছেন আইপিলের ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ান। আর বয়সের হিসেবে স্বীকৃত টি-টোয়েন্টির ইতিহাসের কনিষ্ঠ সেঞ্চুরি করা ব্যাটারের নাম এখন সুরিয়াভানসি। পুরো ইনিংসে যে দাপট দেখিয়েছেন, ব্যাট সুইং করেছেন, স্লগ করেছেন, নিখুঁত টাইমিং দেখিয়েছেন, তা অতিমানবীয় কিছুই ছিল।
হ্যাঁ, এই ইনিংস খেলার পথে বেশ কিছু শটে ভাগ্যের সহায়তাও তিনি পেয়েছেন। অল্পের জন্য ক্যাচ আউট হতে পারতেন কয়েকবারই। তবে এটাই তো ক্রিকেট। আর ভাগ্য তো সাহসীদের পক্ষেই থাকে। আর সুরিয়াভানসি সেই সাহসের শিক্ষাটা পেয়েছেন পরিবার থেকেই। ভারতীয় মিডিয়ার খবরে যা এসেছে, তাতে জানা যায় তার বাবা একজন কৃষক ও পার্টটাইম সাংবাদিক ছিলেন।
তবে ছেলের ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসাকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য তিনি কাজ ছেড়ে দিয়েছেন, যা সুরিয়াভানসি নিজেই বলেছেন। নিয়ম করে ছেলেকে অনুশীলন করতে নিয়ে যাওয়া, অপেক্ষা করে বসে থাকার কাজটা তিনি করে গেছেন। বিহারের মত জায়গার একটা দরিদ্র পরিবারের জন্য এটা অনেক বড় একটা ঝুঁকি। তবে সন্তানের মঙ্গলের জন্য বাবারা তো হরমেশাই এমন ত্যাগ স্বীকার করেই থাকেন…
অবশ্য তিনি সেই সাহসটা করতে পেরেছিলেন বড় ছেলের জন্য, যিনি ভাইয়ের স্বপ্নকে লালন করে দায়িত্ব নেন পরিবারের। নেমে যান আয় উপার্জনে। বাবা-ভাইয়ের এমন অবদানে আড়াল করার সুযোগ নেই সুরিয়াভানসির মায়ের গল্প। দিনের পর দিন তিনি মাত্র তিন ঘণ্টা করে ঘুমিয়েছেন, রাত ২টায় যখন সবাই ঘুমে কাতর, তখন উঠে ছেলের জন্য খাবার প্রস্তুত করতে নেমে গেছেন, যাতে ভোরে ছেলেটা বের হওয়ার আগে সময় মত খাবারটা টেবিলে পায়…
সুরিয়াভানসির মা-বাবা, ভাই তার জন্য এসব যখন করেছেন, তখন তাদের কল্পনাতে ছিল না আজকের দিনের চিত্রটা। হয়ত ছিল। তবে সেখানে যে ছিল স্বপ্ন বাস্তবে রুপ হওয়ার চিন্তাও। এসবের পরও তারা একটি বালকের স্বপ্নকে পরিবার হিসেবে ধারণ করেছেন, সাহস করেছেন একসাথে এগিয়ে যাওয়ার।
কাছ থেকে দেখার কারণে সেই সাহসটা সুরিয়াভানসির মধ্যেও অনুদিত হয়ে গেছে। ফলে, দুনিয়ার বাঘা বাঘা বোলারদের বিপক্ষে মাঠ ভর্তি দর্শকের চাপেও তিনি ভেঙে পড়েন না। চোখে চোখ রেখে তাদের উল্টো আক্রমণ করেন, চার-ছক্কায় ওড়ান বারবার। নামও তাই জুটে গেছে 'বেবি বস'! ভবিষ্যৎ তাকে কোথায় নিয়ে যায়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই আইপিএলে সুরিয়াভানসি দেখিয়ে দিয়েছেন, স্রেফ বয়সের দাঁড়িপাল্লায় যদি মাপতে যান, তাহলে বড্ড ভুলই করবেন বোলাররা। সেটা আজকেও, আগামীতেও…
No posts available.
২০ মার্চ ২০২৬, ১১:২৩ পিএম
২০ মার্চ ২০২৬, ১০:৩৪ পিএম
২০ মার্চ ২০২৬, ৭:০৯ পিএম
১৯ মার্চ ২০২৬, ১০:৫০ পিএম

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অভিষেকেই সেঞ্চুরি—যে কীর্তি ছিল না কোনো নারী ক্রিকেটারের, সেটিই করে দেখালেন রুয়ান্ডার ১৫ বছর বয়সী ফ্যানি উতাগুশিমানিন্দে। নাইজেরিয়া ইনভিটেশনাল উইমেনস টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে ঘানার বিপক্ষে এই বিধ্বংসী ইনিংস খেলে ক্রিকেটের ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন তিনি।
আজ নাইজেরিয়ার লাগোসে ঘানার বোলারদের ওপর তাণ্ডব চালিয়ে ৬৫ বলে ১১১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন উতাগুশিমানিন্দে। এর মাধ্যমে প্রথম নারী ক্রিকেটার হিসেবে টি-টোয়েন্টি অভিষেকে সেঞ্চুরি করার বিশ্বরেকর্ড গড়লেন তিনি। এর আগে ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে ৯৬ রান করে এই তালিকার শীর্ষে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি কারেন রোল্টন।
১৫ বছর ২২৩ দিন বয়সে সেঞ্চুরি করে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের (নারী ও পুরুষ মিলিয়ে) কনিষ্ঠতম সেঞ্চুরিয়ানও এখন উতাগুশিমানিন্দে। তিনি ভেঙে দিয়েছেন উগান্ডার প্রসকোভিয়া আলাকোর রেকর্ড। ২০১৯ সালে মালির বিপক্ষে যখন আলাকো সেঞ্চুরি করেছিলেন, তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর ২৩৩ দিন।
পুরুষ ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত চারজন ব্যাটার অভিষেক ম্যাচে সেঞ্চুরি করলেও পূর্ণ সদস্য কোনো দেশের খেলোয়াড় এই তালিকায় নেই। পুরুষ ক্রিকেটে কনিষ্ঠতম সেঞ্চুরিয়ান ফ্রান্সের গুস্তাভ ম্যাককিওন, যিনি ১৮ বছর ২৮০ দিন বয়সে এই কীর্তি গড়েছিলেন। উতাগুশিমানিন্দে সেই হিসেবে পুরুষ ক্রিকেটের রেকর্ডকেও পেছনে ফেলে দিলেন।
উতাগুশিমানিন্দের ইনিংসে ভর করে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৩ উইকেটে ২১০ রানের পাহাড় গড়ে রুয়ান্ডা। দলের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩২ রান করেন মার্ভেইল ওয়াসে। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ২০ ওভারে ৮ উইকেটে মাত্র ৮৮ রান তুলতে সক্ষম হয় ঘানা। ১২২ রানের বিশাল জয়ে মাঠ ছাড়ে রুয়ান্ডা।

২০ মার্চ এলেই বাংলাদেশ ক্রিকেট ভক্তদের সামনে তামিমে ইকবালের জন্মদিনটি মনে করিয়ে দেয় সংবাদমাধ্যম। তিন সংস্করণের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২৫ সেঞ্চুরির মালিক, বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটার তামিমের ৩৭তম জন্মদিনটি এবার খুব একটা ঘটা করে পালিত হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঈদ উল ফিতরের আগাম বার্তায় বাংলাদেশের লিজেন্ডারি ক্রিকেটারের জন্মদিন নিয়ে হয়নি তেমন আলোচনা। স্ত্রী আয়েশা আক্তারের পোষ্ট, তামিম ভক্তদের শুভেচ্ছা বার্তায় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরনীয় সব জয়ের নায়ককে স্মরণ করেছে সমর্থকরা।
তামিমের জন্মদিনটি প্রথম আলোচনায় এসেছে ২০০৭ সালে, বিশ্বকাপ চলাকালে। বাঁ হাতি ব্যাটিংয়ের জাদুকর ব্রায়ান লারার জন্মস্থানে বাংলাদেশের এক ব্যাটিং বিস্ময়ের আবির্ভাব সেই বিশ্বকাপে দেখেছে বিশ্ব।
সেকারণেই তামিমের ১৮তম জন্মদিন উদযাপনের নিউজটা পেয়েছে সেবার গুরুত্ব। ত্রিনিদাদের হোটেল হিলটনের লবিতে ঢু মেরেই পেলাম তামিমের জন্মদিন উদযাপনের উত্তাপ। তিনদিন আগে কুইন্স পার্ক ওভালে ৫৩ বলে ৫১ রানের ইনিংসে ভারতকে হারানোর নায়ককে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে প্রতিপক্ষ ভারতের সুপার স্টার দ্রাবিড়, সৌরভ, শচিন এসেছেন ছুটে।
তামিমের জন্মদিন এবং জন্মদিনের আশে-পাশের দিনগুলোতে তামিমের কৃতির সঙ্গে বাংলাদেশ দলের সাফল্য এক সময়ে ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ। টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথম উভয় ইনিংসে ফিফটির রেকর্ডটা তার ২১তম জন্মদিনে। মিরপুর টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৮৫-এর পর দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিলেন ৫২। ২০১৭ সালের ১৫ থেকে ১৯ মার্চ কলোম্বোর পি সারা ওভালে বাংলাদেশের শততম টেস্ট জয় দিয়ে রাঙানোর নেপথ্যেও তামিমের ব্যাটিং (৪৯ও ৮২)। চতুর্থ ইনিংসে ১৯১ রান তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ ৪ উইকেটে জিতেছে তামিমের ৮২ রানে। একদিন পর শততম টেস্ট জয়ের নায়ক তামিমের ২৮তম জন্মদিনটা তাই একটু বেশি উৎসবমুখর ভাবেই পালিত হয়েছে।
২০০৮ সালে আয়ারল্যান্ডকে হোয়াইট ওয়াশের নায়ক তামিম ১৯তম জন্মদিন পালন করেছেন একটু বেশি আনন্দে। জন্মদিনে ম্যাচ উইনিং ৪৬ রানের ২ দিন পর ওডিআই ক্যারিয়ারে প্রথম সেঞ্চুরি (১৩৬) উদযাপন করেছেন তামিম মিরপুরে।
২৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনটা তামিম শুরু করেছিলেন এক সপ্তাহ আগে। তার রেশটা ছিল সেই জন্মবার্ষিকী পালনের ২ দিন পরেও। ২০১২ সালের ১১, ১৬, ২০ ও ২২ মার্চ তামিমের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে স্মরণীয়তম। এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৬৪, ভারতের বিপক্ষে ৭০, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫৯ রানের পর ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৬০! টানা ৪ ফিফটি। ভারতের গ্রেট শচিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি উৎসবকে ম্লান করে দিয়ে সেই ম্যাচে ম্যাচ উইনার তামিম। সেদিন মিরপুর স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বার্থডে বয় ক্যাপ-এ ছিল সয়লাব।
২৮তম জন্মদিনের ৫ দিন পর শ্রীলঙ্কার ডাম্বুলায় ১২৭ রানের ইনিংসটিও কাঁপিয়ে দিয়েছে স্বাগতিকদের। ২০২২ সালে ৩৩তম জন্মদিনটি কেটেছে তামিমের দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে। স্বাগতিক দলের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ১ রানে থেমেছেন তামিম। সেই কষ্টটা লাঘব করেছেন ৩ দিন পর। সেঞ্চুরিয়নে তামিমের ৮৭ রানের হার না মানা ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকাকে অবিশ্বাস্যভাবে ৭ উইকেটে হারিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটি থেকে প্রথমবারের মতো ওডিআই সিরিজ জয়ের উৎসব করেছে বাংলাদেশ দল।
জন্মবার্ষিকী বিষাদময় হওয়ার দৃষ্টান্তও দেখেছেন তামিম। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চট্টগ্রামের লোকাল হিরো তামিম নিজের চেনাজানা মাঠে করেছেন হতাশ পারফরমেন্স। হংকংয়ের বিপক্ষে পেয়েছেন ডাক। শুরুর ওই ধাক্কা সামাল দিতে পারেনি বাংলাদেশ। হেরে গেছে বাংলাদেশ হংকংয়ের কাছে।
তারপরও প্লেয়িং ক্যারিয়ারে তামিমের অধিকাংশ জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে আনন্দে, জন্মদিনে তামিম দেশকে দিয়েছেন সুখববর।
২০০৭ বিশ্বকাপে সুপার এইটে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে বিরতির সময়ে লাঞ্চ টেবিলে স্যার ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে বসে খেয়েছি লাঞ্চ। তাও আবার এক টেবিলে বসে ক্যারিবিয়ান লিজেন্ডারির সঙ্গে লাঞ্চ করা কম গর্বের নয়। লাঞ্চের ফাঁকে স্যার ভিভ রিচার্ডসের একটা মিনি ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। ব্যাটিংয়ে বিশ্ব শাসন করতে এসেছেন তামিম, সেই ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন ভিভ রিচার্ডস সেই ইন্টারভিউতে। ১৮-পেরুনে একটা ছেলের মধ্যে যে প্রতিভা দেখতে পেয়েছেন, তার বিচ্ছুরণ দেখেছে বিশ্ব পরবর্তীতে। ৭০ টেস্টে ৩৮.৮৯ গড়ে ৫১৩৪ রান, ২৪৩ ওডিআই ম্যাচে ৩৬.৬৫ গড়ে ৮৩৫৭ রান এবং ৭৮ টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ২৪.০৮ গড়ে ১৭৫৮ রান করে নিজের ব্যাটিং সক্ষমতার জানানই দিয়ে গেছেন তামিম ইকবাল। আড়াই বছর আগে সব ধরণের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে গুডবাই জানিয়েও তাই তামিমের জন্মদিনকে বিশেষভাবে উদযাপনে ভক্তরা থাকে মুখিয়ে।

সিরিজের প্রথম ম্যাচে হারের ধাক্কা সামলে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে নিউ জিল্যান্ড। অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৮ উইকেটে হারিয়ে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গেল স্বাগতিকরা।
দক্ষিণ আফ্রিকার দেওয়া ১৩৭ রানের লক্ষ্যে ১৬.২ ওভারেই টপকে যায় কিউইরা।
রান তাড়ায় শুরু থেকেই প্রোটিয়া বোলারদের কোনো সুযোগই দেননি নিউ জিল্যান্ডের ওপেনাররা। ডেভন কনওয়ে ও টম লাথাম মিলে ওপেনিংয়ে গড়েন ৯৬ রানের জুটি।
কনওয়ে ২৬ বলে ৩৯ রান করে বিদায় নিলেও অপরপ্রান্তে অপরাজিত ছিলেন লাথাম। ৭ চার ও ২ ছক্কায় ৫৫ বলে ৬৩ রানের ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন এই উইকেট কিপার ব্যাটার।
এর আগে টস জিতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ব্যাটিংয়ে পাঠান কিউই অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার। নিউ জিল্যান্ডের বোলারদের তোপের মুখে শুরু থেকেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে প্রোটিয়ারা। এক পর্যায়ে ৬৮ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়ে সফরকারীরা।
শেষ দিকে জর্জ লিনডের ২৩ এবং এনকোবানি মোকোয়েনার ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৯ উইকেটে ১৩৬ রানের সংগ্রহ পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ১০ নম্বরে নামা মোকোয়েনা দলের সর্বোচ্চ ২০ বলে ২৬ রানে অপরাজিত ছিলেন।
নিউ জিল্যান্ডের হয়ে বেন সিয়ার্স, স্যান্টনার ও জেমিসন দুটি করে উইকেট শিকার করেন। ৪ ওভারে ৯ রান খরচায় এক উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা লকি ফার্গুসন।
সিরিজের চতুর্থ টি-টোয়েন্টিতে রোববার ওয়েলিংটনে মাঠে নামবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউ জিল্যান্ড। সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচে জয়ের কোন বিকল্প নেই প্রোটিয়াদের সামনে।

টেস্ট অভিষেকের ১৬ বছর ৪ মাস ৫ দিন পর ১০০ টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এই মাইলস্টোন টেস্টকে বিশেষ মর্যাদায় উদযাপনে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের সাধ্যমত চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের শততম টেস্টকে স্মরণীয় করে রাখতে মাঠে খেলা গড়ানোর আগে বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা করেছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট।
খেলা শুরুর আধঘণ্টা আগে টসের পর দুই দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম-রঙ্গনা হেরাথ নিজেদের মধ্যে পতাকা বদল করেছেন। এরপর ঠিক প্যাভিলিয়নের সামনে শততম টেস্ট উদযাপনে বিশেষ আয়োজন পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেজে ওঠেছে দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত। এর সঙ্গে উত্তোলন করা হয় দুই দেশের পতাকা ও আইসিসিরি পতাকা। শ্রীলঙ্কায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও বিসিবি সভাপতি বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ১০০তম টেস্ট উপলক্ষে ঢাকা থেকে ক্রিকেটারদের জন্য আনা নীল রঙের ব্লেজার এবং বিশেষ টেস্ট ক্যাপ পরিয়ে দেয়া হয় ঐতিহাসিক টেস্টে প্রতিনিধিত্বকারীদের। দু’প্রান্তে বাংলাদেশের পতাকা নেড়ে একদল শিশু-কিশোর নীল গালিচায় ক্রিকেটারদের গার্ড অব অনার দিয়েছে।
বাংলাদেশের শততম টেস্টকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ পদক তৈরি করে রেখেছিল শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট। সেই পদকগুলো ক্রিকেটারদের গলায় পরিয়ে দেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এমপি শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের সভাপতি সুমাথিপালা। বিশেষভাবে তৈরি করা মেডেলগুলোতে লেখা ছিল- ‘কংগ্রাচুলেশন অন দ্য সেঞ্চুরি টেস্ট ম্যাচ প্লেড বাই বাংলাদেশ।’
এছাড়া লঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড বিসিবির তৎকালীন সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনকেও দিয়েছে বিশেষ উপহার। হাতির একটি মূর্তিকে রূপালি রঙের প্রলেপ দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে কাচের বক্সের ফ্রেম আকারে তুলে দেয়া হয় বিসিবি সভাপতির হাতে। এক ফ্রেমে দুই দল বন্দি হয়েছে ফটোসেশনে, পরে উড়েছে লাল-সুবজ রঙের বেলুন।
নিউ জিল্যান্ডের ডানেডিনে বাংলাদেশের ৫০তম টেস্ট উদযাপনে শুধু স্বাক্ষীই নয়, ওই টেস্ট স্মরণীয়ভাবে উদযাপনে ঢাকা থেকে আমার আইডিয়া এবং বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেট ফ্যান ক্লাব বেঙ্গল টাইগার্সের অর্থায়নে ৫০টি চাবির রিং, এবং দুটি ক্রেষ্ট বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেই টেস্টের প্রথম দিনে লাঞ্চ ব্রেকের সময় বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক নাইমুর রহমান দুর্জয়কে দিয়ে বাংলাদেশ অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল এবং নিউ জিল্যান্ড অধিনায়ক ভেট্টরির হাতে আমি এবং দুর্জয় তুলে দিয়েছিলাম ওই দুটি বিশেষ ক্রেস্ট। বাংলাদেশের ৫০তম টেস্ট কভার করতে যাওয়া বাংলাদেশ-নিউ জিল্যান্ড সাংবাদিকদের সবাইকে এবং দুদলের ক্রিকেটারদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম বিশেষ স্মারক চাবির রিং।
শততম টেস্টকে সামনে রেখে গণমাধ্যমের অজান্তে এমন কিছুর পরিকল্পনা ছিল এবং তা বাস্তবায়ন করেছি। বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের তৎকালীন সহ-সভাপতি শেখ বশির আহমেদ মামুন ভাইকে রাজি করিয়ে ১০০টি চাবির রিং বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার পরিকল্পনায় শততম টেস্ট উপলক্ষ্যে একটা বিশেষ কেকও অর্ডার দিয়ে বানিয়েছিলেন তিনি। শততম টেস্টের আগের রাতে একটা সৌজন্য ডিনারে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এবং বাংলাদেশ থেকে শততম টেস্ট কভার করতে আসা সাংবাদিকদের সম্মানে আপ্যায়িত করেছিলেন তিনি। বিসিবি থেকে যে উদ্যোগ নেয়ার কথা, সেই উদ্যোগটা মামুন ভাই নিয়ে বিপদে পড়েছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ম্যানেজার এবং বিসিবির তৎকালীন পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন ক্ষুব্ধ হয়ে কেকের উপর চালিয়েছেন ক্রোধ! উপস্থিত সাংবাদিক, ক্রিকেটাররা হতভম্ব হয়েছেন তার এই আচরণে। অথচ, পরদিন বেঙ্গল টাইগার্সের সাব্বির আহমেদ রুবেল, গোলাম ফারুক ফটিকের সঙ্গে মুশফিকুর রহিম এবং রঙ্গনা হেরাথকে ম্যাচ ভেন্যুতে দিয়েছি শততম টেস্টের বিশেষ ক্রেস্ট, তখন কিন্তু ওই ক্রেস্ট দিতে এগিয়ে এসেছেন খালেদ মাহমুদ সুজন।
বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া মিলিয়ে বাংলাদেশের শততম টেস্টে কভার করেছেন যেসব সাংবাদিক, তাদের সবার নাম এবং স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছি। টেস্ট জয়ের পর বাংলাদেশের শততম টেস্ট স্কোয়াডের সবার অটোগ্রাফ নিয়েছি। এসব দিয়ে বিশেষ ডিজাইনেকাঠের উপর লেজার কাটিং করে স্মরণীয় স্মৃতি সংগ্রহে রেখেছি। টেস্ট সিরিজের ট্রফিটি ঢাকা থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন ওই সিরিজের টাইটেল স্পন্সরশিপ করা আবু নেওয়াজ সোহাগ। আমার উচ্ছ্বাস দেখে ট্রফিতে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শততম টেস্ট জয়ের সেই ট্রফিকে নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ফটো সেশনের আগেই কিন্তু ট্রফিটি উঠেছিল আমার হাতে!
১৯ মার্চ, ২০১৭-কলম্বোর পি সারা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের শততম টেস্ট জয় দিয়ে উদযাপন। এমন একটি দিন, এমন একটি গর্বিত মাইলস্টোন কেনো বিসিবিকে মনে করিয়ে দিতে হবে, কেনো দিনটি বিশেষ মর্যাদায় উদযাপিত হবে না ? এটাই প্রশ্ন।

কাকতালীয় হলেও সত্য, ওয়ানডে, টেস্ট, টি-টোয়েন্টি-এই তিন ফরম্যাটের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিনটিই রাঙিয়েছে বাংলাদেশ জয় দিয়ে। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকা স্টেডিয়ামে ভারতকে ১৫ রানে হারিয়ে শততম ওয়ানডে ম্যাচ জয়ের উৎসব করেছে হাবিবুল বাশার সুমনের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দল। ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ কলোম্বোর পি সারা ওভালে শ্রীলঙ্কাকে ৪ উইকেটে হারিয়ে শততম টেস্ট জয়ে ইতিহাস রচনা করেছে মুশফিকুর রহিমের নেতৃত্বে বাংলাদেশ। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও শততম ম্যাচ জয় দিয়ে রাঙিয়েছে বাংলাদেশ দল। যে জয়টি সূচিত হয়েছে ২০২১ সালের ২২ জুলাই।
আজ (১৯ মার্চ, ২০২৬) পাঠকের সামনে তুলে ধরছি ৯ বছর আগে শততম টেস্ট জয়ের স্মৃতি। শততম টেস্ট বলে কথা, দেশের মাটিতে শততম টেস্ট খেললে দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকতো ওই বিশেষ টেস্ট। বাংলাদেশের মাটিতে আয়োজন করা যেতো, শততম টেস্ট। ফিউচার ট্যুর প্রোগামে (এফটিপি) সেইভাবে হিসাব মিলিয়ে নিতে পারতো বিসিবি। কিন্তু সেই হিসাবটা মাথায় রাখেনি নাজমুল হাসান পাপনের নেতৃত্বাধীন বিসিবি। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলোম্বোর পি সারাভামাত্তু স্টেডিয়ামে ১৫ থেকে ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের শততম টেস্ট।
বিরতির ঠিক ৪৮ মিনিট পর ৫৮তম ওভারের পঞ্চম বলে যখন ২টি রান নিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। রঙ্গনা হেরাথ বল করছিলেন প্রেসবক্স প্রান্ত থেকে। তিন বল আগে তাঁর টার্ন ও বাউন্সে পরাস্ত হয়ে ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হয়ে এসেছেন মোসাদ্দেক হোসেন। মিরাজ পঞ্চম বলটি সুইপ করলেন স্কয়ার লেগে। বল যতটা গিয়েছিল, হতে পারত ৩ রান। কিন্তু জয়ের জন্য দরকার ২ রান, তা-ই নিয়ে উল্লাসে হাওয়ায় দুহাত ছুড়লেন মিরাজ। জিতে গেল বাংলাদেশ।
শ্রীলঙ্কাকে তাদেরই মাটিতে ৪ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশ তার শততম টেস্টে পেয়েছে স্বপ্নের মতো এক জয়। টেস্ট পরিবারে সবার শেষে এসে চতুর্থ দল হিসেবে এই কীর্তিটা গড়া সামান্য প্রাপ্তি নয়। এর আগে নিজেদের শততম টেস্ট জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান। বাংলাদেশও লিখল শততম টেস্ট জয়ে ইতিহাস।
শততম টেস্টের ল্যান্ডমার্ক স্পর্শ করতে সময়ের হিসেবে বাংলাদেশের লেগেছে ১৬ বছর ৪ মাস ৫ দিন। এখানেও বাংলাদেশ রচনা করেছে ইতিহাস। আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শততম টেস্টের ল্যান্ডমার্কে এই সময়টাই সবচেয়ে কম।
৯৯তম টেস্টটি খেলেছে বাংলাদেশ গল-এ। ৭ থেকে ১০ ডিসেম্বরে গল-এ অনুষ্ঠিত সিরিজের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ হেরে গেছে ২৫৯ রানে। দুই ইনিংসে মাহমুদউল্লাহ করেছেন ৮ এবং ০! তাতেই কোপ পড়েছে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের। শততম টেস্টে বাংলাদেশ একাদশে জায়গা হয়নি এই মিডল অর্ডারের। তার জায়গায় টেস্ট অভিষেক হয়েছে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের।
কেনো মাহমুদউল্লাহকে দেওয়া হয়েছে বাদ, শততম টেস্ট কভার করা বাংলাদেশ সাংবাদিকদের সে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বিসিবির তৎকালীন সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এমপি-
'হাতুরুর কোনো ভূমিকা নেই। প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত আমার। এখানে হাতুরুর কথা কেনো আসছে, আমি তা বুঝি না। এই যে মাহমুদউল্লাহ টেস্ট খেলবে না, এটা তো আমার সিদ্ধান্ত। তাতে ফেরত পাঠিয়ে দেয়ার কথা কিংবা ওডিআই স্কোয়াডে নেই, এমন কোনো কথা কেউ আমাকে বলেনি। আমার কাছে তো আসতে হবে আগে। তাছাড়া আমার কাছে হাতুরু কখনো কিছু পাঠায় না। লিস্ট পাঠায় নির্বাচকরা। হাতুরুকে এর মধ্যে টেনে আনার কোনো কারণ খুঁজে পাই না।'
শততম টেস্টের একাদশ নির্বাচনে বিসিবি সভাপতি বেশ গর্ব করেই বলেছিলেন তার হস্তক্ষেপের কথা। এমন হস্তক্ষেপ তিনি করেছেন অসংখ্যবার। তবে এই একটি হস্তক্ষেপে অন্তত লাভ হয়েছে বাংলাদেশের।
এক অর্থে মাহমুদউল্লাহর রিপ্লেশমেন্টটি ছিল শততম টেস্টে যথার্থ সিদ্ধান্ত। কারণ, শততম টেস্টে অভিষেক ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরির (৭৫ ) রেকর্ডে মোসাদ্দেক দ্বিতীয়। এর আগে রেকর্ডটি ছিল শুধু ইংল্যান্ডের শততম টেস্টে অভিষিক্ত জ্যাক শার্পের। ১৯০৯ সালে করেছিলেন তিনি ৬১ রান।
এই টেস্টে সৌম্য ৫টি ক্যাচ নিয়ে করেছেন রেকর্ড। বাংলাদেশ উইকেট কিপারদের মধ্যে টেস্টে প্রথম ডিসমিসালের সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছেন মুশফিকুর রহিম। ক্যারিয়ারের ৫৪তম টেস্টে এসে এই মাইলস্টোনে পা রেখেছেন তিনি।
শততম টেস্টের প্রথম দিন থেকেই চালকের আসনে ছিল বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কাকে ৩৩৮ রানে প্রথম ইনিংস থামিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ লিড নিয়েছে ১২৯ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে (৩/৭৮) সাকিব (৪/৭৪), মোস্তাফিজের (৩/৭৮) বোলিংয়ে চতুর্থ ইনিংসে ১৯১ রানের টার্গেটটা সহজ করে দিয়েছেন বাঁ হাতি ওপেনার তামিম। তার ৮২ রানের ইনিংসে বাংলাদেশ পেয়েছে জয়ের আবহ। বাকি কাজটা করেছেণ সাব্বির রহমান (৪১), মুশফিক (২২*)।
শততম টেস্ট জয়ের শুভক্ষণের জন্য পি সারা ওভালের প্রেস বক্সের উপরে টিভি প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাংলাদেশ থেকে আসা একদল সাংবাদিক। শততম টেস্টের শুভক্ষণে বাংলাদেশের সংবাদকর্মীদের অনুভূতি, মাঠ থেকে উচ্ছ্বাস ক্যামেরায় ধারণ করেছেন ফটো সাংবাদিক রতন গোমেজ।