৫ মে ২০২৬, ৪:৫৭ পিএম

৭২ বছর আগের কথা। সালটা ১৯৫৪। ফুটবল বিশ্ব তখন আজকের মতো এত হিসেবি ছিল না। রক্ষণ সামলে খেলা বা ‘বাস পার্ক’ করার মতো শব্দগুলো তখনো জন্ম নেয়নি। সেই সময়ে সুইজারল্যান্ডে বসেছিল বিশ্বকাপের পঞ্চম সংস্করণ। আর সেই বিশ্বকাপে যা ঘটেছিল, তা শুনলে বর্তমানের যেকোনো ফুটবল ভক্তের চোখ কপালে উঠবে।
আল্পস পর্বতমালা আর এক পশলা গোলের বৃষ্টি। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হতে বাকি আর মাত্র ৩৭ দিন। তার আগে ফুটবল ইতিহাসের ধুলো জমা পাতাও উল্টে দেখলে উঠে আসে ১৯৫৪ বিশ্বকাপের এক অদ্ভুত ইতিহাস।
সেবার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে বা প্রথম পর্বের মাত্র ১৮ ম্যাচে গোল হয়েছিল ৯২টি! গড়ে প্রতি ম্যাচে গোল হয়েছিল ৫টার বেশি (৫.১১)। এখনকার সময়ে আমরা একটা ম্যাচে ৫ গোল দেখলেই অবাক হই, আর তখন সেটা ছিল প্রতি ম্যাচের সাধারণ চিত্র।
সেই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বটা ছিল অনেকটা হ্যাটট্রিকের মেলার মতো। আজকাল সারা টুর্নামেন্ট জুড়ে একটা হ্যাটট্রিক খুঁজে পাওয়াই দায় হয়ে পড়ে, আর সেবার শুধু প্রথম পর্বেই আটটি হ্যাটট্রিক হয়েছিল! হাঙ্গেরির জাদুকর স্যান্ডর কোকসিস তো একাই দুই ম্যাচে দুই হ্যাটট্রিক করে বসেন। এ ছাড়া অস্ট্রিয়া, তুরস্ক, উরুগুয়ে, পশ্চিম জার্মানি আর স্বাগতিক সুইজারল্যান্ডের ফুটবলাররাও হ্যাটট্রিকের জোয়ারে গা ভাসিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার—ফুটবল ইতিহাসে আর কোনো বিশ্বকাপের পুরো টুর্নামেন্টে এতগুলো হ্যাটট্রিক কেউ দেখেনি, যা সেবার শুধু প্রথম রাউন্ডেরই দেখা গিয়েছিল।
১৬ দলের বিশ্বকাপ ছিল সেবার। দলগুলো মাঠে নামত একটাই লক্ষ্য নিয়ে—কে কত বেশি গোল করতে পারে। অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি কিংবা পশ্চিম জার্মানির মতো দলগুলো যখনই মাঠে নামত, গোলবন্যা বয়ে যেত। এমনকি ইংল্যান্ড আর বেলজিয়ামের মধ্যকার ম্যাচটাও ড্র হয়েছিল ৪-৪ গোলের রোমাঞ্চে। সেই গ্রুপ পর্বের ৯২টি গোল এত বেশি ছিল যে, পরবর্তী সময়ে হওয়া ছয়টি আলাদা আলাদা বিশ্বকাপের (যেমন ১৯৬৬ বা ২০১০) পুরো টুর্নামেন্টের মোট গোলের চেয়েও তা বেশি!
সেই সময়কার ফুটবলে কতটা নিয়ম-কানুন ছিল সে প্রশ্ন আসতেই পারে। ৩৭ দিন পর যখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা মেক্সিকোয় ২০২৬ বিশ্বকাপ বসবে, এত গোল হবে কি না, এই আলোচনাও হতে পারে। এবারের বিশ্বকাপ আরেকটি রেকর্ডই এরই মধ্যে করেছে, সবচেয়ে বেশি ৪৮ দল অংশগ্রহণ করবে। ম্যাচ ও দল বেড়ে যাওয়া ১৯৫৪ বিশ্বকাপের প্রথম পর্বের গোলের রেকর্ড ভাঙার একটা সম্ভাবনাও থাকছে।
কিন্তু যখনই ফুটবলের ইতিহাসে গোলের উৎসব নিয়ে কথা হবে, তখনই ১৯৫৪ সালের সেই সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপের কথা আসবেই। যেখানে পাহাড়ের চূড়ায় প্রতিধ্বনিত হতো কেবলই দর্শকদের উল্লাস আর জালের ভেতর বল আছড়ে পড়ার শব্দ।
পুরো বিশ্বকাপের ২৬ ম্যাচে মোট গোল হয়েছিল ১৪০টি, কিন্তু সেই প্রথম পর্বের ৯২ গোলই আসলে সেই টুর্নামেন্টকে অমর করে রেখেছে।, ভাবা যায় মাত্র ১৮ ম্যাচে ৯২ গোল? আজকের দিনে এটা ভাবা মানে শুধুই রূপকথার গল্প শোনা!
No posts available.
৬ মে ২০২৬, ৩:২৭ পিএম

২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র ৩১ দিন বাকি। বিশ্বকাপে জ্বরে কাঁপছে পুরো বিশ্ব। ঠিক এই সময়ে ফিফা তাদের স্মৃতিভাণ্ডার থেকে তুলে আনল এমন এক অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান, যা ফুটবলপ্রেমীদের নতুন করে তর্কে মেতে ওঠার রসদ জুগিয়েছে। আজকের গল্পের নায়ক কোনো প্রথাগত ড্রিবলিং জাদুকর নন, বরং স্পেনের রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী- সার্জিও রামোস।
গল্পটা ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের। জোহানেসবার্গে সেই সোনালী ট্রফি জয়ের পথে স্পেন যেন এক অভেদ্য দুর্গ গড়ে তুলেছিল। রামোস তখন খেলতেন রাইট-ব্যাক হিসেবে। রক্ষণে তিনি কতটা ভয়ংকর ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে এক অনন্য রেকর্ডে—পুরো টুর্নামেন্টে স্পেন গোল হজম করেছিল মাত্র দুটি। এর আগে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্স, ২০০৬ বিশ্বকাপে ইতালি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে মাত্র দুই গোল হজমের যে রেকর্ড গড়েছিল, রামোসরা তাতে ভাগ বসিয়েছিলেন।
কিন্তু ২০১০ বিশ্বকাপে রামোস কেবল রক্ষণের দেয়াল হয়েই থাকেননি, তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক 'আনলাইকলি ড্রিবল ডন'। মাঠের পরিসংখ্যান বলছে, সেবার রামোস অবিশ্বাস্যভাবে ৩১টি ড্রিবল সম্পন্ন করেছিলেন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, মেসি, ইনিয়েস্তা বা রোবেনের মতো জাদুকরদের ছাপিয়ে সেবার রামোসই ছিলেন তালিকার শীর্ষে!
সেই তালিকায় রামোসের পেছনে ছিলেন লুকাস পোডলস্কি (২৭), আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা (২৬)। এমনকি সর্বকালের অন্যতম সেরা লিওনেল মেসি এবং ডেভিড ভিয়া (উভয়েই ২৫) কিংবা ডাচ উইঙ্গার আরিয়েন রোবেনও (২৪) রামোসের সেই ড্রিবলিং ঝড়ের কাছে নতিস্বীকার করেছিলেন। রক্ষণ সামলে একজন ডিফেন্ডার কীভাবে আক্রমণের ধার বাড়িয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ তছনছ করে দিতে পারেন, রামোস ছিলেন তার উদাহরণ।
পরবর্তী বিশ্বকাপগুলোতে ড্রিবলিংয়ের ব্যাটন অবশ্য পুরোপুরে চলে গেছে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের কাছে। ২০১৪ সালে লিওনেল মেসি, ২০১৮ সালে ইডেন হ্যাজার্ড আর ২০২২ বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপে ছিলেন ড্রিবলিংয়ের রাজা। কিন্তু একজন ডিফেন্ডার হয়েও রামোস যা করেছেন—একজন ডিফেন্ডার হিসেবে অসাধারণ কীর্তি।
২০২৬ বিশ্বকাপের এই ক্ষণগণনায় ফিফা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, ফুটবল মানেই অনিশ্চয়তা। আর একজন কট্টর রক্ষনভাগের খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারেন টুর্নামেন্টের সেরা ড্রিবলার।

১৯৭৪ সালের সেই জার্মানি বিশ্বকাপ। ফুটবলের মানচিত্রে তখন এক নতুন বিপ্লবের নাম ‘টোটাল ফুটবল’। আর সেই মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজনই—ইয়োহান ক্রুইফ। তাঁর খেলার ধরন কেবল ফুটবল ছিল না, ছিল যেন মাঠের ক্যানভাসে আঁকা এক জীবন্ত জ্যামিতি।
২০২৬ বিশ্বকাপের বাকি আর ৩৩ দিন। বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ এলে ক্রুইফের অবিশ্বাস্য কীর্তিও সতেজ হয়ে ওঠে। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের হয়ে ক্রুইফ ৩৬টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন। এক বিশ্বকাপে কোনো একক খেলোয়াড়ের তৈরি করা সর্বোচ্চ সুযোগের রেকর্ড এটি, যা আজও কেউ ভাঙতে পারেনি। এমনকি ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনাও ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ২৭টি সুযোগ তৈরি করে ক্রুইফের পেছনে পড়ে আছেন।
গল্পটা শুরু হয় সেই কমলা রঙের জার্সি গায়ে এক ‘উড়ন্ত ডাচম্যানের’ অবিশ্বাস্য দাপট দিয়ে। ক্রুইফ মাঠে থাকা মানেই ছিল প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য এক গোলকধাঁধা। বল পায়ে নিয়ে যখন তিনি ছুটতেন, মনে হতো ঘাসের ওপর দিয়ে কোনো জাদুকর হেঁটে যাচ্ছেন। সেই বিশ্বকাপে তিনি ৭ ম্যাচে ৩টি গোল করেছিলেন, ৩ গোলে সরাসরি সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু পরিসংখ্যান দিয়ে ক্রুইফকে বোঝা অসম্ভব।
সুইডেনের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের কথা ভাবুন। মাঠের এক কোণে বল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ক্রুইফ, সামনে সুইডিশ ডিফেন্ডার ওলসন। হঠাৎ শরীরের এক মোচড়ে বলটিকে নিজের পায়ের পেছন দিয়ে ঘুরিয়ে নিলেন—জন্ম নিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কারুকার্য ‘ক্রুইফ টার্ন’। সেই ম্যাচে তিনি রেকর্ড ১২টি সফল ড্রিবলিং করেছিলেন। ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে তাঁর চেয়ে বেশি ড্রিবলিং করতে পেরেছেন কেবল তিনজন— ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইতালির বিপক্ষে নাইজেরিয়ার তারকা জে-জে ওকোচা (১৫টি), ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জাইরজিনহো ১৩টি সফল ড্রিবলিং করেছিলেন উরুগুয়ের বিপক্ষে এবং ১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের পল গ্যাসকোয়েন (১৩টি)।
ক্রুইফ কেবল একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, ছিলেন মাঠের ভেতর একজন কোচ! তিনি জানতেন কখন কাকে কোথায় পাস দিতে হবে, কখন নিজে আক্রমণ করতে হবে। তাঁর ৩৬টি গোলের সুযোগ তৈরির পরিসংখ্যানই বলে দেয়, তিনি গোল করার চেয়ে গোল করানোর কারিগর হিসেবে কতটা নিখুঁত ছিলেন। তবে আক্ষেপও কম ছিল না ক্রুইফের নেদারল্যান্ডস শিরোপার কাছাকাছি গিয়েও ফাইনালে ২-১ গোলে হেরে যায় পশ্চিম জার্মানির কাছে।
ফুটবল আসবে, ফুটবল যাবে; কিন্তু সেই সরু গড়নের ডাচ ফুটবলারের পায়ের জাদু আর টোটাল ফুটবলের সোনালী দিনগুলো চিরকাল ফুটবল অমর হয়ে থাকবে। ক্রুইফ মানেই সেই অমর সৃষ্টিশীলতা, যা আজও ফুটবলকে সুন্দর ও শৈল্পিক করে রেখেছে।

আগামী জুনে অনুষ্ঠেয় ফিফা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা নিয়ে বড় ধরণের শর্ত জুড়ে দিয়েছে ইরান। দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজ জানিয়েছেন, ইরানের বিশেষ সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কে কোনো প্রকার অপমান করা হবে না—ফিফাকে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে।
গত সপ্তাহে ফিফা কংগ্রেসে যোগ দিতে গিয়ে কানাডা সীমান্ত থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয় মেহেদি তাজের নেতৃত্বাধীন ইরানি প্রতিনিধি দল। দেশটির কর্মকর্তাদের দাবি, সেখানে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের হাতে তারা অপমানের শিকার হয়েছেন। যদিও কানাডার ইমিগ্রেশন মন্ত্রী পরবর্তীকালে পার্লামেন্টে জানান, আইআরজিসির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে মাঝ আকাশে থাকাকালীনই মেহেদি তাজের ভিসা বাতিল করা হয়েছিল।
২০২৪ সালে কানাডা আনুষ্ঠানিকভাবে আইআরজিসি-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে প্রথম দেশ হিসেবে আইআরজিসি-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। মেহেদি তাজ ফুটবল প্রশাসনে আসার আগে ইসফাহান প্রদেশে আইআরজিসির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তেহরানে এক সরকারি সমাবেশে যোগ দিয়ে তাজ বলেন, ‘আমাদের জাতীয় প্রতীক এবং বিশেষ করে আইআরজিসি-কে অপমান করার অধিকার তাদের নেই। যদি ফিফা এ বিষয়ে আমাদের শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে, তবেই আমরা যাব। তা না হলে কানাডার মতো পরিস্থিতি আবারও হতে পারে।‘
আরও পড়ুন
| কাল দেশ ছাড়ছে নারী ফুটবল দল |
|
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে দেখা দিয়েছিল অনিশ্চয়তা। তবে সেই কালো মেঘ এখন অনেকটাই কেটে গিয়েছে। ইরানের ফুটবল প্রধান বলেন, ‘আমরা বিশ্বকাপে যাচ্ছি কারণ আমরা যোগ্যতা অর্জন করেছি। বিশ্বকাপে আমাদের আয়োজক ফিফা, ডোনাল্ড ট্রাম্প বা আমেরিকা নয়। তারা যদি আমাদের আতিথেয়তা দিতে রাজি হয়, তবে আমাদের সামরিক সংস্থাকে অপমান না করার বিষয়টিও তাদের মানতে হবে।‘
আগামী ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে গ্রুপ 'জি'-তে রয়েছে ইরান। ১৫ ও ২১ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে তাদের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়াম। এরপর ২৬ জুন সিয়াটলে মিশরের মুখোমুখি হবে তাঁরা।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, ইরানি ফুটবলারদের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণে ওয়াশিংটনের কোনো আপত্তি নেই। তবে আইআরজিসির সাথে কোনো প্রকার সংশ্লিষ্টতা থাকা কাউকে তাদের মাটিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
সম্প্রতি ফিফার মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম ইরানি প্রতিনিধিদলকে ২০ মে-র মধ্যে ফিফা সদর দপ্তরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেখানে আগামী জুনে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর নিরাপত্তা ও ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে আলোচনা হবে।

১৯৯৯ সালের সেই অভিশপ্ত রাত। সান সিরোর গ্যালারি তখন স্তব্ধ। ফুটবল বিশ্ব বিস্ময়ে দেখল, যার পায়ে বল থাকলে মনে হতো সৃষ্টিকর্তা কোনো জাদুকরকে পাঠিয়েছেন, সেই রোনালদো নাজারিও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। হাঁটুর মালাইচাকিটা যেন ভেতর থেকে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা মাথা নেড়েছিলেন, সমর্থকরা চোখের জল মুছেছিলেন—সবাই ধরে নিয়েছিলেন, ‘দ্য ফেনোমেননের’ সূর্য বোধহয় সময়ের আগেই অস্তমিত হলো।
পরের গল্পটা ছিল আরও ভয়াবহ। দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে মাঠে ফেরার পর আবারও চোটের কবলে পড়েন রোনালদো। তাঁর ফিজিওথেরাপিস্ট নিলটন পেট্রোনের ভাষায়, ‘যখন সে ফিরল, তার হাঁটুর টেন্ডন পুরোপুরি ছিঁড়ে গিয়েছিল। হাঁটুর হাড়টি যেন বিস্ফোরিত হয়ে উরুর মাঝখানে চলে এসেছিল।’
টানা আড়াই বছর মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছিল এই কিংবদন্তিকে। এমনকি তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে বলেও অনেকে ধরে নিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন
| আল্পসের বুকে গোলের সুনামি, অবিশ্বাস্য ১৯৫৪ বিশ্বকাপ এখনো অমর |
|
আড়াই বছর রোনালদোর কাছে ছিল এক অন্ধকার সুরঙ্গ। মাঠের সবুজ ঘাসের বদলে তাঁর দিন কাটত হাসপাতালের সাদা দেয়ালে আর ফিজিওথেরাপির যন্ত্রণাদায়ক টেবিলে। ফুটবল যখন তাঁকে ছাড়া এগিয়ে যাচ্ছিল, ব্রাজিল দল তখন ধুঁকছিল। বাছাইপর্ব পার হতেই কালঘাম ছুটে যাচ্ছিল সেলেসাওদের। গোল করার লোক নেই, জেতানোর মতো সেই জাদুকরী ছন্দ নেই।
২০০২ বিশ্বকাপের আর মাত্র ৪০ দিন বাকি। কোচ লুই ফিলিপ স্কোলারি যখন দল ঘোষণা করলেন, সারা ব্রাজিল স্তম্ভিত। দলে এমন একজনের নাম, যিনি গত আড়াই বছরে ঠিকমতো ৯০ মিনিট দৌড়াতে পারেননি। ইন্টার মিলানের বেঞ্চে বসে থাকা এক ‘অচল’ খেলোয়াড়কে কেন বিশ্বকাপে নেওয়া হলো? সাংবাদিকদের তোপের মুখে স্কোলারি শুধু একবার তাকালেছিলেন, তাঁর চোখে ছিল জেদ। ভরাট কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি পাগল! তাই ওকে নিয়েছি।’
রোনালদোর তখনো ইন্টার মিলানের হয়ে নিয়মিত খেলতে শুরু করেননি। এমনকি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে যুগোস্লাভিয়া ও পর্তুগালের বিপক্ষে মাত্র ৪৫ মিনিটের ঝাপসা উপস্থিতিও সমর্থকদের আশ্বস্ত করতে পারেনি।
কিন্তু স্কোলারির সেই ‘পাগলামির’ উত্তর দিতে রোনালদো বেছে নিলেন কোরিয়া-জাপানের মাঠকে। প্রথম ম্যাচ থেকেই বোঝা গেল, চোট তার হাঁটু কেড়ে নিলেও তার ভেতরকার আগুন নেভাতে পারেনি। প্রতিটা ম্যাচে তিনি যখন দৌড়াতেন, মনে হতো যেন কোনো ফিনিক্স পাখি ভস্ম থেকে ডানা ঝাপটে আকাশে উড়ছে। যে ডিফেন্ডাররা তাকে আটকানোর ছক কষতেন, তারা শুধু রোনালদোর ছায়াটাই ধরতে পারতেন।
প্রতি ৬৯ মিনিটে একটি গোল—এ যেন কোনো ফুটবলারের পরিসংখ্যান নয়, বরং এক অতিমানবের পুনর্জন্ম। ফাইনালের সেই রাত, প্রতিপক্ষ শক্তিশালী জার্মানি আর দুর্ভেদ্য অলিভার কান। কিন্তু রোনালদো সেদিন ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। জোড়া গোল করে যখন তিনি স্টেডিয়ামের কোণায় দৌড়ে গিয়ে উদযাপন করছিলেন, তখন আর কেউ তাকে ‘অচল’ বলার সাহস পায়নি।
আড়াই বছরের অন্ধকার, অগণিত অস্ত্রোপচার আর মানুষের অবজ্ঞা—সবকিছুকে পায়ের জাদুতে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে রোনালদো সেদিন সোনালী ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরেছিলেন। স্কোলারির সেই তথাকথিত ‘পাগলামি’ সেদিন ফুটবলের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ কাব্য হয়ে লেখা হয়ে গেল। সেটা যে মাস্টারস্ট্রোক ছিল, তা বোঝা গেল এশিয়ায় বিশ্বকাপ শুরু হতেই। আড়াই বছরের চোট কাটিয়ে আসা রোনালদো মাঠে নামলেন ক্ষুধার্ত বাঘের মতো। ২০০২ বিশ্বকাপে প্রতি ৬৯ মিনিটে একটি করে গোল করেছিলেন তিনি।
পুরো টুর্নামেন্টে মোট ৮টি গোল করে ব্রাজিলকে পঞ্চম শিরোপা জিতিয়েছিলেন রোনালদো। যার মধ্যে জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে করা সেই ঐতিহাসিক জোড়া গোলও ছিল। ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে ফুটবল সম্রাট হয়ে ফেরার সেই গল্প আজও ফুটবল প্রেমীদের রোমাঞ্চিত করে।
২০২৬ বিশ্বকাপের আগে রোনালদোর উত্তরসূরী নেইমার জুনিয়রের অবস্থাও একই। বিশ্বকাপের ৩৬ দিন বাকি থাকলেও ব্রাজিল অবশ্য এখনো দল ঘোষণা করেনি। নেইমার থাকবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তা তো আছেই। তবে নেইমারও প্রায় আড়াই বছর জাতীয় দলের বাইরে। তাঁকে নিয়ে কি কার্লো আনচেলত্তি একটা মাস্টারস্ট্রোক খেলবেন? নেইমারও কি পারবেন রোনালদো হয়ে উঠতে? সমর্থকেরা হয়তো সে অপেক্ষা-ই করছেন।