
গত এক দশক ধরে ব্রাজিল ফুটবলের সমার্থক শব্দ হয়ে আছেন তিনি; দলের যেকোনো সংকটে বারবার আবির্ভূত হয়েছেন একমাত্র ত্রাতা হিসেবে। ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকার আরাধ্য ট্রফিটা ছোঁয়া না হলেও, বছরের পর বছর ধরে সেলেসাওদের আক্রমণের মূল ভরসা ছিলেন তিনিই। কিন্তু চোটের ভয়াল থাবায় দীর্ঘ তিন বছর জাতীয় দলের বাইরে থাকায় অনেকেই শেষ দেখছিলেন তাঁর।
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, ৩৪ বছর বয়সী সেই মহাতারকা নেইমার জুনিয়রকে রেখেই যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করেছে ব্রাজিল। আর বিশ্বমঞ্চের দলে এই রূপকথার মতো প্রত্যাবর্তনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন এই ফরোয়ার্ড।
নিজের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে এক ভিডিও বার্তায় কান্নাভেজা চোখে নেইমার বলেন,
‘এই মুহূর্তে আবেগ ধরে রাখা সত্যিই কঠিন। বিগত দিনগুলোতে আমরা যে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি, বিশেষ করে মানুষ আমাকে যেভাবে কষ্টের মুখোমুখি হতে দেখেছে—সেসব পেরিয়ে আজ এখানে পৌঁছানো এবং আরেকটি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাওয়াটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমার চোখের এই জল স্রেফ খাঁটি আনন্দের।’
ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নেইমার আরও যোগ করেন,
‘আমাকে সমর্থন করার জন্য এবং আমার ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রতিটি ব্রাজিলিয়ানকে আমি মন থেকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমাদের সামনে লড়াই করার জন্য আরেকটি বিশ্বকাপ হাজির। আমরা ব্রাজিলে ট্রফি ফিরিয়ে আনার জন্য মাঠে নিজেদের জীবন বাজি রেখে খেলব, এটা নিশ্চিত।’
নেইমারের শারীরিক সক্ষমতা ও ফিটনেস নিয়ে শুরুতে অনেক বড় সংশয় থাকলেও, সান্তোসের হয়ে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার পেলেন এই ফরওয়ার্ড। আনচেলত্তি নিজেই জানিয়েছেন, আসন্ন বিশ্বকাপে নেইমার তাঁর দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে যাচ্ছেন। এই ডাক পাওয়ার মধ্য দিয়ে ৩৪ বছর বয়সী এই মহাতারকার সামনে ক্যারিয়ারের বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফিটি ছোঁয়ার শেষ সুযোগ তৈরি হলো। তবে ব্রাজিলের শুরুর একাদশে জায়গা করে নেওয়াটা নেইমারের জন্য মোটেও সহজ হবে না; কারণ এই মুহূর্তে দলে তাঁর পজিশনে ম্যাথিউস কুনিয়া এবং লুকাস পাকেতা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
জাতীয় দলের হয়ে নেইমারের এই প্রত্যাবর্তন ঘটছে দীর্ঘ তিন বছর পর। ফলে সেলেসাওদের জার্সিতে তাঁর দীর্ঘদিনের গোলের খরা কাটানোর এটিই সবচেয়ে বড় মঞ্চ। তাছাড়া, রদ্রিগো এবং এস্তেভাওয়ের মতো তারকাদের সাম্প্রতিক ইনজুরির কারণে আনচেলত্তির কৌশলে নেইমার এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন, কারণ বিশ্বমঞ্চের মতো কঠিন জায়গায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দলের জন্য যেকোনো মুহূর্তে নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে। শুধু মাঠের খেলাই নয়, নেইমারের ফেরার মাধ্যমে ব্রাজিল ড্রেসিংরুমে একজন সত্যিকারের দলনেতা বা ‘লিডার’ ফিরে পেল, যা সর্বোচ্চ স্তরের টুর্নামেন্টে লড়াই করার জন্য বড্ড প্রয়োজন।
বিশ্বকাপকে সামনে রেখে রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের কৌশল ইতিমধ্যেই অনেকটা স্পষ্ট। আক্রমণভাগের দুই উইংয়ে রাফিনিয়া এবং ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে রেখে ছক কষছেন কোচ আনচেলত্তি। এরসঙ্গে মাঝমাঠে ‘অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার’ হিসেবে ম্যাথিউস কুনিয়ার নিয়মিত উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, কেমন হতে যাচ্ছে সেলেসাওদের মূল একাদশ। এমন এক সেটআপে নেইমারের ভূমিকা ঠিক কী হবে—তা নিয়ে যখন ফুটবলপাড়ায় তুমুল বিতর্ক, ঠিক তখনই আনচেলত্তি খোলসা করলেন তাঁর আসল পরিকল্পনা। ইতালিয়ান এই মাস্টারমাইন্ড জানিয়েছেন, আসন্ন বিশ্বকাপে ৩৪ বছর বয়সী এই মহাতারকাকে ‘ইনসাইড ফরোয়ার্ড’ হিসেবে খেলানো হবে।
আল হিলালে থাকার সময় একের পর এক ইনজুরির ধাক্কায় নেইমারের খেলার ধরনে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। গতি বা পেস দিয়ে এখন আর প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের পরাস্ত না করলেও, উইঙ্গার থেকে তিনি এখন পুরোদস্তুর একজন সৃষ্টিশীল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারে রূপান্তরিত হয়েছেন। এখন তাঁর মূল শক্তি হলো নিখুঁত ড্রিবলিং, অসাধারণ ফুটবলীয় ভিশন এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যূহ ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার মতো ‘থ্রু পাস’ দেওয়ার ক্ষমতা। আর নেইমারের এই জাদুকরী সৃষ্টিশীলতা দলের সামগ্রিক খেলার ধার বাড়াতে ব্যবহার করতে চান আনচেলত্তি; যা ম্যাথিউস কুনিয়া কিংবা লুকাস পাকেতারা জাতীয় দলের জার্সিতে ধারাবাহিকভাবে করতে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন। আনচেলত্তির এই নতুন ছক বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলকে কাঙ্ক্ষিত সোনালী ট্রফি এনে দিতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
No posts available.
১৯ মে ২০২৬, ১০:৫০ পিএম
১৯ মে ২০২৬, ১০:৩০ পিএম
১৯ মে ২০২৬, ৯:৪৫ পিএম
১৯ মে ২০২৬, ৯:৩৭ পিএম

বিশ্বকাপে ‘জে’ গ্রুপে অস্ট্রিয়া। দীর্ঘ ২৮ বছর পর বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্টে ফেরা দলটির গ্রুপে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ছাড়াও রয়েছে আলজেরিয়া ও জর্ডান। বলা চলে, বেশ কঠিন গ্রুপেই পড়েছে ইউরোপের এই দলটি। গ্রুপে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ থাকলেও দৃঢ় মনোবল অস্ট্রিয়ান স্ট্রাইকার সাসা কালাইচিচের। ২৮ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার সাফ জানিয়ে রাখলেন, আর্জেন্টিনার মতো প্রতিপক্ষ দেখে মাঠের লড়াইয়ের আগেই কুঁকড়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই তাদের।
কালাইচিচ বলেন,
‘আমার মতে, কোনো প্রতিপক্ষকে ভয় পাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে এই দল নিয়ে তো নয়ই। আমাদের দলে কিছু অবিশ্বাস্য ব্যক্তিগত নৈপুণ্যনির্ভর মেধাবী খেলোয়াড় আছে; কিন্তু একতা, দলীয় চেতনা, দৃঢ়তা ও তাড়নাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।’
তিনি আরও যোগ করেন,
‘এটা স্রেফ এক ঐক্যবদ্ধ শক্তি এবং ছেলেরা অবিশ্বাস্য কাজ করেছে। তারা বাছাইপর্বে গ্রুপ সেরা হয়ে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে, যা দীর্ঘদিন ধরে সম্ভব হয়নি। আপনি এখন সারা দেশের সেই উচ্ছ্বাস অনুভব করতে পারবেন এবং অস্ট্রিয়ার প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে প্রত্যেকেই অবিশ্বাস্যভাবে গর্বিত।’
আগামী সোমবার বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করে অস্ট্রিয়া। রিয়াল মাদ্রিদ ডিফেন্ডার ডেভিড আলাবা ছাড়াও দলটিতে রয়েছেন টটেনহ্যাম ডিফেন্ডার কেভিন ডানসো, বায়ার্ন মিউনিখ মিডফিল্ডার কনরাড লাইমার, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড মিডফিল্ডার মার্সেল সাবিতজার ও আরবি লাইপজিগ মিডফিল্ডার ক্রিস্টোফ বাউমগার্টনার। চেনা তারকাদের নিয়ে গড়া এই স্কোয়াডের কারণেই উচ্চাশার কমতি নেই কালাইচিচের।
দলের শক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন,
‘অস্ট্রিয়া সবসময় আগ্রাসী ঘরানার ফুটবল খেলে এবং আমাদের দলে সেই ধরনের ফুটবল খেলার মতো উপযুক্ত খেলোয়াড় আছে। আপনি যখন মাঠে তীব্রতা আর পূর্ণ নিবেদন নিয়ে খেলবেন, তখন তা প্রতিপক্ষের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তুলবে। আমরা আসলে খেলোয়াড়, কোচ, স্টাফ ও সমর্থকদের নিয়ে খুব ঘনিষ্ঠ একটি দল—পুরো দেশটাই এখন এক সুতোয় গাঁথা।’
প্রায় তিন দশক পর বিশ্বকাপে ফিরে গ্রুপ পর্বেই বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে অস্ট্রিয়াকে। আগামী ২২ জুন টেক্সাসে অনুষ্ঠিত হবে হাইভোল্টেজ এই ম্যাচটি। তবে তার আগে ১৭ জুন ‘জে’ গ্রুপের প্রথম ম্যাচে নবাগত জর্ডানের মুখোমুখি হবে তারা। আর ২৭ জুন গ্রুপের শেষ ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামবে অস্ট্রিয়ানরা।
তিনি বলেন,
“এটা স্রেফ এক ঐক্যবদ্ধ শক্তি এবং ছেলেরা অবিশ্বাস্য কাজ করেছে। তারা বাছাইয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে, দীর্ঘদিন যা হয়নি। আপনি এখন সারা দেশের সেই উচ্ছ্বাস অনুভব করতে পারবেন এবং অস্ট্রিয়ার প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে প্রত্যেকেই অবিশ্বাস্যভাবে গর্বিত।”

মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামে নারী ফুটসাল লিগে খেলা দেখতে আজ উপস্থিত ছিলেন ৭-৮শ' দর্শক। এক একটা গোলের পর উল্লাসে ফেটে পড়েছেন তারা, স্লোগান দিচ্ছিলেন সাবিনা, মাসুরা, সুমাইয়াদের নিয়ে। দর্শকদের সেই উল্লাস শুরু থেকে চললো ম্যাচ শেষ পর্যন্ত। মঙ্গলবার চাঁদপুর এফসিকে যে সাবিনাদের দল আইএম টেন এফসি উড়িয়ে দিয়েছে ১৮-০ গোলে।
খেলা শেষে দলের নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় ভক্ত, দর্শকদের এই আনন্দটুকু দিতে পারাটাই তাঁদের সবচেয়ে বড় পাওয়া। তেমনি মাসুরা নিজেও কিন্তু ফুটবলে পার ভক্ত ব্রাজিলের। গত রাতে বিশ্বকাপের জন্য ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াড দিয়েছেন প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি।
অনেক জল্পনার পর আনচেলত্তির দলে জায়গা পেয়েছেন নেইমার জুনিয়র। ব্রাজিলের সাপোর্টার হিসেবে নেইমারকে দলে নেওয়ায় বেজায় খুশি মাসুরা। পাশাপাশি একটু অখুশি নিজের আইডল থিয়াগো সিলভা না থাকাতে। তবুও জানালেন কেউ না থাকলেন তিনি ব্রাজিলের সাপোর্ট করবেন। বলেন,
'ব্রাজিল দলে নেইমার আছে, দেখার পর খুবই ভালো লাগছে। আর কেউ থাকুক বা না থাকুক, ব্রাজিল সাপোর্ট করি আমি, সব সময় সাপোর্ট করব।'
সবশেষ ২০০২ সালের বিশ্বকাপে পঞ্চমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। হেক্সা মিশন তাদের আর সফল হয়নি। দলের সাপোর্টার হিসেবে এবার সেই কাঙ্খিত আশা পুরণ হবে বলে মনে করেন মাসুরা,
'ব্রাজিল ভালো খেলবে, ভালোর চেষ্টা করবে। তারপর কাপের ইচ্ছা তো সবারই থাকে, তো ব্রাজিলেরও থাকবে (চ্যাম্পিয়ন হওয়ার)। আশা করতে সমস্যা আছে কী।'
দেশের নারী ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীন। ২০২২ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশের জেতা সাফ দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। এরপর ফুটসালেও প্রথমবারের মতো গত বছর সাফ জিতেছেন সাতক্ষীরা থেকে উঠে আসা এই তারকা।
এখন ফুটসালের সঙ্গেই আছেন বাফুফের চুক্তিবদ্ধ এই ফুটবলার। যখন আবার ফুটবলের দায়িত্ব পাবেন তখন নিজেকে সেখানেই মানিয়ে নেবেন, এ নিয়ে কোনো হতাশা কিংবা ক্ষোভ নেই তাঁর।আপাতত ফুটসাল উপভোগ করছেন বলে জানালেন। লিগে তাঁর দলও উড়ছে। প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিচ্ছে আইএম টেন এফসি। তবু প্রতিটি দলতে সমীহ করছেন তিনি।
মাসুরা বলেন,
'প্রত্যেকটা ম্যাচই আমরা চ্যালেঞ্জিং হিসেবে নেই। সে ভালো খেলুক আর না খেলুক, প্রতিপক্ষ সবসময় শক্তিশালীই হয়। তো আজ ওদের গোলকিপার অনেক ভালো খেলছে।'
আজকের ম্যাচে প্রায় পুরোটা সময় গ্যালারি থেকে সাবিনা-মাসুরা-কৃষ্ণাদের উৎসাহ জুগিয়েছেন সমর্থকেরা। ম্যাচ শেষে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মাসুরা বলেন,
'জিতলে তো সব সময় ভালো লাগা কাজ করে। আর আমরা মাঠে নামি একটা ভালো ম্যাচ খেলার জন্য, দলের জন্য, দর্শকদের জন্য। তো আমাদের জয়ে তারা (দর্শক) অনেক খুশি হয়েছে, এটাই আমাদের পাওয়া। আমরা সবসময় চেষ্টা করি আমাদের ভালো, ভালো পারফরমেন্সটা দেওয়ার।'
মাসুরা পারভীনরা এভাবেই সব সময় দর্শকদের আনন্দের কারণ হয়েছেন। সেটা যখন ফুটবল মাঠে ছিলেন তখন যেমন করেছেন, এখন দায়িত্ব যখন ফুটসাল কোর্টে, চিরচেনা সেই মাসুরার দেখাই মিলছে।

২০২৬ বিশ্বকাপের ক্ষণগণনা শুরু হতেই বড়সড় ধাক্কা খেল আর্জেন্টিনা। চোটের কারণে আলবিসেলেস্তাদের তরুণ তুর্কি নিকো পাজের বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় শঙ্কা। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ‘দিয়ারিও ওলে’ জানিয়েছে, এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের বাঁ-হাঁটুর চোট লিওনেল স্কালোনির জন্য চরম অস্বস্তি ও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাজের চোটের অবস্থা ও সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি তাঁর মেডিকেল স্টাফ থেকে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে জরুরি ভিত্তিতে ইতালিতে পাঠাচ্ছেন। ‘দিয়ারিও ওলে’ জানিয়েছে, নিকো পাজের ক্লাব কোমো ও আর্জেন্টিনার মধ্যে এই মুহূর্তে বেশ উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
ইতালিয়ান ক্লাব কোমোর হয়ে চলতি মৌসুমে অবিশ্বাস্য ছন্দে থাকা ২১ বছর বয়সী এই তারকা ইতালিয়ান সিরি-আ’তে ভেরোনার বিপক্ষে ম্যাচে হাঁটুতে চোট পান। চোটের তীব্রতার কারণে সবশেষ পার্মার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটিতেও মাঠে নামতে পারেননি।
কোমোর কোচিং স্টাফের পক্ষ থেকে পেশি কিংবা লিগামেন্টের গুরুতর কোনো চোটের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হলেও, শঙ্কা কাটছে না। ওলে-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিকো পাজের বাঁ-হাঁটুর হাড়ে চোট লেগে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আর মাত্র ২২ দিন পরই উত্তর আমেরিকায় গড়াতে যাচ্ছে ফুটবলের মহোৎসব। বিশ্বকাপের স্কোয়াডে জায়গা করে নেওয়ার দৌড়ে অন্যতম ফেভারিট নিকো পাজকে নিয়ে কোনো রকম ঝুঁকি নিতে নারাজ আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। বিশ্বমঞ্চের ঠিক আগমুহূর্তে দলের এই ভবিষ্যৎ তারকার চোট আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ পরিকল্পনায় বড়সড় ধাক্কা দেবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
অবশ্য আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ‘টিওয়াইসি স্পোর্টস’-এর সাংবাদিক গ্যাস্টন এদুল জানিয়েছেন, আলবিসেলেস্তেদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আঘাতের ধরন দেখে যতটা খারাপ মনে হয়েছিল, পরিস্থিতি আসলে ততটা গুরুতর নয়। পাজ একদম ঠিক আছেন এবং খুব দ্রুতই মাঠে ফিরছেন। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন,
‘কোমোর পরের ম্যাচেই খেলবেন নিকো পাজ। তিনি নিশ্চিতভাবেই আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের রাডারে আছেন। যেভাবে আঘাতটা লেগেছিল তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত, কিন্তু তিনি এখন ভালো আছেন।’
ইতালিয়ান সিরি-আ’তে রূপকথার মতো এক মৌসুম পার করছে কোমো, যার মূল কাণ্ডারি ও মাস্টারমাইন্ড তরুণ আর্জেন্টাইন প্লেমেকার নিকো পাজ। আগামী সপ্তাহে লিগের শেষ রাউন্ডের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে টেবিলের ৫ নম্বরে রয়েছে কোমো। ৩৭ ম্যাচ শেষে ৬৮ পয়েন্ট নিয়ে ইতিমধ্যেই তারা আগামী মৌসুমের ইউরোপা লিগ নিশ্চিত করে ফেলেছে। তবে ক্লাবটির মূল লক্ষ্য এখন শীর্ষ চারে থেকে কাঙ্ক্ষিত চ্যাম্পিয়নস লিগের টিকিট কেটে ফেলা।
কোমোর এই ঐতিহাসিক পথচলায় নিকো পাজের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান এক কথায় অবিশ্বাস্য। ২০২৫-২৬ মৌসুমে লিগে ৩৩টি ম্যাচ খেলেছেন (যার মধ্যে ২৯টিতেই ছিলেন শুরুর একাদশে) এবং নিজে বল জালে জড়িয়েছেন ৬ বার। তবে শুধু গোল করাই নয়, মাঝমাঠের সর্তীথদের দিয়ে গোল করাতেই বেশি পটু তিনি। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৭টি গোল (অ্যাসিস্ট)। এছাড়া পুরো মৌসুমে তাঁর পাসিং অ্যাকুরেসি ছিল ৮৪.১% এবং প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ২.৪টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন পাজ।
পরিসংখ্যানের এই দুর্দান্ত গ্রাফই নিকো পাজকে আর্জেন্টিনার চূড়ান্ত বিশ্বকাপ স্কোয়াডের জন্য সবচেয়ে জুতসই বিকল্প হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মুকুট ধরে রাখার মিশনে স্কালোনির জন্য স্কোয়াডের গভীরতা হবে সবচেয়ে বড় শক্তি। দীর্ঘ এই টুর্নামেন্টে অভিজ্ঞ ফুটবলারদের চোট বা ক্লান্তির সময়ে পাজের মতো একজন এলিট তরুণ প্রতিভাই পারেন দলের ভাগ্য বদলে দিতে। তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জার্সিতে আরও একটি সোনালী তারা যোগ করার মিশনে এই পাজই হতে পারেন স্কালোনির অন্যতম সেরা ট্রাম্প কার্ড।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেই বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে হতে পারে আর্জেন্টিনাকে। আগামী ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপের মিশন শুরু করবে বিশ্বকাপের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। গ্রুপ ‘জে’ তে লিওনেল মেসি-জুলিয়ান আলভারেজদের পরের দুই প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া ও জর্ডান।

দুই ভাই লিয়েন্দ্রো বাকুনা ও জুনিও বাকুনাকে নিয়ে বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করেছে কুরাসাও। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে কম জনসংখ্যার এই দলটির নেতৃত্বে থাকবেন অ্যাস্টন ভিলার সাবেক ফুটবলার লিয়েন্দ্রো বাকুনা।
দুই লাখের কম জনসংখ্যার দেশ কুরাসাও এবারই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে লড়াই করতে যাচ্ছে। দলটির কোচ ডিক অ্যাডভোকাট বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হিসেবে রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন। তার বর্তমান বয়স ৭৮ বছর। এই ডাচ মাস্টারমাইন্ড এর আগে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস এবং ২০০৬ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রয়েছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমি থেকে উঠে আসা উইঙ্গার তাহিথ চং। দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই ৩৪ বছর বয়সী লিয়েন্দ্রো খেলেন ডাচ ক্লাব ভলেনডামে এবং ছোট ভাই জুনিও খেলেন ইংলিশ ক্লাব বার্মিংহাম সিটিতে।
কুরাসাওয়ের গোলপোস্টের নিচে অভিজ্ঞ অ্যালয় রুমের উপস্থিতি দলটিকে বড় শক্তি জোগাবে। আর রক্ষণভাগে কোচের মূল ভরসা হিসেবে থাকছেন জুরিয়েন গারি ও রোশন ভ্যান ইজমা।
বিশ্বকাপে ‘ই’ গ্রুপে থাকা কুরাসাও আগামী ১৪ জুন জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তাদের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে। এই গ্রুপে তাদের অপর দুই প্রতিপক্ষ ইকুয়েডর ও আইভরি কোস্ট।
কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার: টাইরিক বোডাক, ট্রেভর ডুরনবুশ, এলয় রুম।
ডিফেন্ডার: রিশেডলি বাজোয়ের, জশুয়া ব্রেনেট, রোশন ভ্যান ইজমা, শেরেল ফ্লোরানুস, ডেভেরন ফনভিল, জুরিয়েন গারি, আরমান্ডো ওবিস্পো, শুরান্ডি সাম্বো।
মিডফিল্ডার: জুনিও বাকুনা, লিয়েন্দ্রো বাকুনা, লিভানো কোমেনেনসিয়া, কেভিন ফেলিডা, আর’জানি মার্থা, টাইরেস নোসলিন, গডফ্রেড রোমেরাথু।
ফরোয়ার্ড: জেরেমি আন্তোনিসে, তাহিথ চং, কেঞ্জি গোরি, সন্টজে হ্যানসেন, জার্ভেন কাস্তানির, ব্র্যান্ডলি কুয়াস, ইয়ুর্গেন লোকাডিয়া, জের্ল মার্গারিটা।

"বিশ্বকাপের ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্নটা হয়তো তাঁরও ছিল, কিন্তু এক নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সব থেমে গেছে। মাঠের সবুজ ঘাসে এবার হয়তো পর্তুগালের জার্সিতে তাঁকে দেখা যাবে না, কিন্তু দলের ছায়া হয়ে প্রতি ম্যাচে থাকবেন তিনি। প্রয়াত পর্তুগাল ফরোয়ার্ড দিয়েগো জোতার সেই অপূর্ণ স্বপ্ন আর স্মৃতিকে সঙ্গী করেই এবার বিশ্বমঞ্চে নামছে পর্তুগাল।
পর্তুগালের প্রধান কোচ রবের্তো মার্তিনেস বিশ্বকাপের জন্য ২৭ সদস্যের দল ঘোষণা করেছেন। তবে বিশ্বকাপের জন্য ফিফার নিয়ম মেনে চূড়ান্ত দল হতে হবে ২৩ থেকে ২৬ জনের। তাতে এই দল থেকে অন্তত একজন যে বাদ পড়ছেন, সেটা নিশ্চিত। চার গোলকিপারকে দলে রেখেছেন পর্তুগাল কোচ, সেখান থেকেই একজন বাদ পড়বেন। তিনজনের বেশি গোলকিপার রাখা যায় না একটা স্কোয়াডে।
প্রয়াত জোতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই স্কোয়াডে রাখা হয়েছে একটি প্রতীকী ‘প্লাস ওয়ান (+১)’। দল ঘোষণার সময় পর্তুগাল কোচ মার্তিনেস নিশ্চিত করেছেন, তুরস্কের ক্লাব জেনশ্লেরবির্লিগি আঙ্কারার হয়ে খেলা চতুর্থ পছন্দের গোলকিপার রিকার্দো ভেলহো দলের সঙ্গে ভ্রমণ করবেন। তবে নিবন্ধিত তিন গোলকিপারের কেউ চোট পেলেই কেবল তাকে অফিসিয়াল ২৬ সদস্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
ইউয়েফা নেশনস লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল এবার যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মিশন শুরু করবে ১৭ জুন, হিউস্টনে; যেখানে ‘গ্রুপ কে’র প্রথম ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো। একই ভেন্যুতে আগামী ২৩ জুন তারা মুখোমুখি হবে উজবেকিস্তানের এবং ২৭ জুন মিয়ামিতে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে গ্রুপ পর্বের লড়াই শেষ করবে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো-ব্রুনো ফার্নান্দেসরা।
স্কোয়াড নিয়ে কথা বলার সময় কোচ মার্তিনেস জানান, তাঁর এই দল মূলত ‘২৭ জন খেলোয়াড় এবং প্লাস ওয়ান (+১)’-এর সমন্বয়ে গঠিত। আর এই ‘প্লাস ওয়ান’ হলেন লিভারপুলের সাবেক ফরোয়ার্ড দিয়েগো জোতা, গত বছরের জুলাইয়ে মাত্র ২৮ বছর বয়সে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি।
জোতাকে স্মরণ করে মার্তিনেস আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,
‘ও আমাদের শক্তি, আমাদের আনন্দ। দিয়েগোকে হারানোটা ছিল এক অবিস্মরণীয় এবং ভীষণ কঠিন মুহূর্ত। কিন্তু তার ঠিক পরদিনই আমাদের সবার দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল দিয়েগোর স্বপ্ন এবং জাতীয় দলে সে সবসময় যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছে, সেটার জন্য লড়াই করা। দিয়েগো জোতার চেতনা, শক্তি এবং উদাহরণই হলো আমাদের স্কোয়াডের সেই ‘প্লাস ওয়ান (+১)’; এবং ও সবসময়ই আমাদের সেই প্লাস ওয়ান হয়ে থাকবে।’
স্কোয়াডে চারজন গোলকিপার এবং পাঁচজন ফুলব্যাক রাখার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন কোচ মার্তিনেস। পাশপাশি দল থেকে মাতেউস ফার্নান্দেস, রিকার্দো হোর্তা এবং পেড্রো গঞ্জালভেসের মতো তারকাদের বাদ দেওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
মার্তিনেস বলেন,
‘এই টুর্নামেন্টের জটিলতাগুলো বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ—আবহাওয়া, টাইম জোন এবং এর সঙ্গে জড়িত সব চাহিদার মুখোমুখি আমরা গত মার্চেই হয়েছি। এমন কিছু পজিশন আছে যেখানে আমাদের প্রতি পজিশনে দুজনের বেশি খেলোয়াড় রাখা প্রয়োজন। আর আমাদের পাঁচজন ফুলব্যাক দরকার।’
দলের ট্যাকটিক্যাল লাইন-আপ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি দিওগো দালোত, জোয়াও কানসেলো এবং মাথেউস নুনেসের বহুমুখী খেলার ক্ষমতার ওপর জোর দেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ফাঁকফোকরে খেলার জন্য জোয়াও ফেলিক্স, ব্রুনো ফার্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা এবং ফ্রান্সিসকো ত্রিনকাওয়ের মতো আক্রমণাত্মক বিকল্পগুলোর কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি উইং ধরে আক্রমণ করার জন্য রাফায়েল লেয়াও, পেড্রো নেতো এবং ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওয়ের শক্তির কথাও তুলে ধরেন কোচ।
মার্তিনেস আরও যোগ করেন, ভেলহো কেবলই একজন ট্রেনিং গোলকিপার হিসেবে স্কোয়াডে নিজের ভূমিকাটা ভালোভাবে বোঝেন। একইসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, ফিফার নিয়ম অনুযায়ী টুর্নামেন্ট চলাকালীন কেবল কোনো খেলোয়াড় চোট পেলেই তাকে পরিবর্তন করার অনুমতি দেওয়া হবে।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হিসেবে আগামী ৬ জুন ওইরাসে চিলির বিপক্ষে এবং ১০ জুন লেইরিয়াতে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে পর্তুগাল। এছাড়া ফিফার নির্দেশনা অনুযায়ী, নিজেদের প্রথম ম্যাচের অন্তত পাঁচ দিন আগে দলটিকে ফ্লোরিডার পাম বিচে তাদের নির্ধারিত ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দিতে হবে।