
মোহাম্মদ সালাহ ‘স্বার্থপরের মতো’ আচরণ করেছেন এবং ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে অ্যানফিল্ডে অলরেডদের মৌসুমের শেষ ম্যাচের স্কোয়াড থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া উচিত— এমনটাই মন্তব্য করেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক স্ট্রাইকার ওয়েন রুনি।
অ্যাস্টন ভিলার কাছে ৪-২ গোলে হেরে লিভারপুলের চ্যাম্পিয়নস লিগ ভাগ্য যখন শঙ্কায়, তখন সালাহ এক বিবৃতিতে বলেন, লিভারপুলকে আবার সেই ‘হেভি মেটাল অ্যাটাকিং দল’ হিসেবে ফিরতে হবে। যাকে প্রতিপক্ষ ভয় পায়।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মিশরীয় রাজপুত্র লেখেন,
‘আমি এই ফুটবলই খেলতে জানি এবং এটাই ক্লাবের আসল পরিচয়, যা পুনরুদ্ধার করা ও ধরে রাখা উচিত। এটি নিয়ে কোনো আপস হতে পারে না এবং যারা এই ক্লাবে যোগ দেবে, তাদের অবশ্যই এর সাথে মানিয়ে নিতে হবে।’
সালাহর এই পোস্টটিকে মূলত কোচ আর্নে স্লটের প্রকাশ্য সমালোচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এ নিয়ে ‘দ্য ওয়েন রুনি শো’-তে রুনি বলেন,
‘লিভারপুলের হয়ে সে (সালাহ) যা কিছু অর্জন করেছে। তার এমন এক শেষ দেখাটা সত্যিই দুঃখজনক। স্লটকে লক্ষ্য করে তাঁর এভাবে আবারও খোঁচা দেওয়ার কোনো মানে হয় না।’
রুনি আরও যোগ করেন,
‘সে হেভি মেটাল ফুটবল খেলতে চায়, যার মানে সে আসলে ইয়ুর্গেন ক্লপের ফুটবল স্টাইল ফিরে পেতে চাইছে। কিন্তু আমার মনে হয় না সালাহ এখন আর সেই উচ্চ গতি ও তীব্রতার ফুটবলের সাথে মানিয়ে নিতে পারবেন। তাঁর সেই ধার আর নেই।’
নিজের ক্যারিয়ারের উদাহরণ টেনে রুনি বলেন,
‘আমি যদি আর্নে স্লট হতাম, তবে শেষ ম্যাচে সালাহকে স্টেডিয়ামের আশেপাশেও ঘেঁষতে দিতাম না। ওল্ড ট্রাফোর্ডে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের শেষ ম্যাচে আমার সাথেও তাঁর দ্বিমত ও ঝামেলা হয়েছিল, যার কারণে ফার্গুসন আমাকে স্কোয়াডের বাইরে রেখেছিলেন।’
No posts available.

টানা দুই মৌসুমের দুঃস্বপ্ন পেছনে রেখে রিয়াল মাদ্রিদের সব মনোযোগ এখন আগামী মৌসুমের দল গোছানোর ওপর। আর এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে ডাগআউট থেকেই, যেখানে সবার চোখ এখন হোসে মরিনিয়োর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের দিকে। গুঞ্জন আছে, সবকিছু ঠিক থাকলে দুই মৌসুমের চুক্তিতে স্প্যানিশ জায়ান্ট ক্লাবটিতে ফিরবেন এই পর্তুগিজ মাস্টারমাইন্ড। সেই চেনা ক্লাবে, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত যে রিয়াল মাদ্রিদকে তিনি নিজের 'ঘর' বানিয়ে নিয়েছিলেন।
সব হিসাব-নিকাশ মিলে যাওয়ার পর মরিনিয়ো যদি শেষ পর্যন্ত রিয়ালের ডাগআউটে পা রাখেনই, তবে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে এক বিশাল কাজের তালিকা। যার মধ্যে রয়েছে—ভেঙে পড়া ড্রেসিংরুম জোড়া লাগানো, দলের জন্য নতুন নেতা খুঁজে বের করা, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও কিলিয়ান এমবাপের মধ্যকার ইগোর লড়াই থামিয়ে মাঠে তাদের রসায়ন জমিয়ে তোলা এবং আগামী মৌসুমের জন্য দলের কোন কোন পজিশনে নতুন খেলোয়াড় লাগবে, তা দ্রুত চিহ্নিত করা।
ভাঙা ড্রেসিংরুম জোড়া লাগানো
গত কদিন রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুম অবিশ্বাস্য সব ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছে। ওভিয়েদোর বিপক্ষে ম্যাচের পর রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুমের ভেতরের ফাটলগুলো আরও একবার নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়ে যায়। অরেলিয়েন চুয়ামেনি ও ফেদেরিকো ভালভার্দের মধ্যে মারামারির খবর সামনে আসার পর এটিই ছিল রিয়ালের প্রথম ঘরের মাঠে ম্যাচ। ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ তো জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে নির্বাচনই দিয়ে দিলেন!
কিলিয়ান এমবাপে কেবল নিজের কোচের সমালোচনাই করেননি, একই সঙ্গে সতীর্থদেরও একহাত নিয়েছেন। মিক্সড জোনে এসে ফরাসি এই ফরোয়ার্ড বলেন, ‘আমি এখানেই (সরাসরি) কথা বলতে পছন্দ করি। অনেকেই সেটা করে না, যার কারণে তারা কী ভাবছে সেটা জানতে আমাকে সংবাদপত্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।’
ড্রেসিংরুমের এই ভাঙন জোড়া লাগিয়ে দলে ঐক্য ফিরিয়ে আনাই হবে মরিনহোর প্রথম মিশন। ড্রেসিংরুমকে আবার এমন একটা জায়গায় রূপ দিতে হবে যেখানে খেলোয়াড়রা মিডিয়া লিক বা মিক্সড জোনে এসে মন্তব্য না করে, নিজেদের মধ্যকার ঝামেলাগুলো আড়ালে বসে মিটিয়ে নেবে। পুরো মৌসুম জুড়েই রিয়ালের ভেতরের এই উত্তেজনা বারবার সামনে এসেছে। ক্লাসিকোতে বিতর্কিত আচরণের পর জাবি আলোনসোর কাছে সরাসরি ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দলে একা হয়ে পড়েছিলেন ভিনিসিয়ুস। আলভারো আরবেলোয়া কোনোমতে এই ব্রাজিলিয়ানকে কিছুটা শান্ত রাখলেও, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় প্রকাশ্যেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন, যার সর্বশেষ উদাহরণ এমবাপ্পের এই ক্ষোভ।
কয়েক মাস ধরেই তুষের আগুনের মতো জ্বলছিলে—এমবাপে ইস্যু। ফ্রান্সের সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, রিয়ালের ডাক্তাররা এমবাপ্পের হাঁটুর ভুল ইনজুরি ডায়াগনসিস করেছিলেন। সব মিলিয়ে মরিনিয়োর সবচেয়ে বড় ‘হোমওয়ার্কই’ ড্রেসিংরুমের সব আগুনে জল ঢালা।
নতুন ‘নেতা’ খুঁজে বের করা
রিয়াল মাদ্রিদ বেশ কয়েক বছর ধরেই একটা প্রজন্ম পরিবর্তনের (জেনারেশনাল ট্রানজিশন) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা এখন প্রায় শেষের পথে। লুকা মদ্রিচের বিদায়ের পর ক্লাবটিতে মরিনিয়োর প্রথম মেয়াদের শেষ প্রতিনিধিও হারিয়ে গেছে। আর এই গ্রীষ্মে দানি কারভাহালও যদি প্রত্যাশিতভাবে ক্লাব ছাড়েন, তবে পাঁচ বছরে চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা ঐতিহাসিক দলের আর কোনো সদস্যই স্কোয়াডে অবশিষ্ট থাকবে না। এমনকি রিয়ালের ‘লা ডেসিমা-তেরসেরা’ (১৩তম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) জয়ী দলের একমাত্র টিকে থাকা খেলোয়াড় দানি সেবালোসও নাকি ক্লাব ছাড়ার দ্বারপ্রান্তে।
এর আগেই টনি ক্রুস এবং নাচো ফার্নান্দেজের মতো ড্রেসিংরুমের প্রভাবশালী খেলোয়াড়রা সান্তিয়াগো বার্নাব্যুকে বিদায় জানিয়েছেন। এই পটপরিবর্তনের মধ্যেও রিয়াল আরও দুটি ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছে; যার পেছনে মূল কারিগর ছিল একঝাঁক তরুণ তুর্কি। আশা করা হয়েছিল এরাই দলের ভবিষ্যৎ নেতা হয়ে উঠবে, বিশেষ করে ফেদেরিকো ভালভার্দে এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। দুজনেই ইতিমধ্যে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেছেন, কিন্তু সাবেক অধিনায়ক সার্জিও রামোসের মতো সেই জাঁদরেল ও কর্তৃত্বপূর্ণ নেতৃত্ব এখনো কেউ মাঠে ফুটিয়ে তুলতে পারেননি।
কারভাহালের পর অধিনায়কত্বের ব্যাটন ক্রমান্বয়ে যাওয়ার কথা ভালভার্দে, ভিনিসিয়ুস, থিবো কোর্তোয়া, এদের মিলিতাও এবং ফেরলঁ মেন্দির কাছে। কিন্তু এই তালিকার প্রত্যেকের নামের পাশেই ঝুলে আছে বড় বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন! চুয়ামেনির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ মারামারির কারণে ভালভার্দের ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। অন্যদিকে ভিনিসিয়ুস এখনও বার্নাব্যুর দর্শকদের সঙ্গে পুরোপুরি সংযোগ তৈরি করতে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছেন। কোর্তোয়াকে নিয়ে উঠছে অন্য প্রশ্ন—গোলকিপারদের অধিনায়ক বানানোর ক্ষেত্রে মরিনিয়োর অনীহা নাকি সবসময়ই। আর বাকি থাকা মিলিতাও এবং মেন্দির ক্যারিয়ার তো প্রতিনিয়ত চোটের আঘাতেই জর্জরিত।
শেষ পর্যন্ত রিয়ালের ডাগআউটে যিনিই ফিরুন না কেন, মাঠে রিয়ালের জন্য একজন প্রকৃত এবং স্পষ্ট নেতা খুঁজে বের করাই হবে তাঁর অন্যতম বড় পরীক্ষা।
ভিনি-এমবাপের রসায়ন জমিয়ে তোলা
গত দুই মৌসুমে কার্লো আনচেলত্তি, জাবি আলোনসো কিংবা আলভারো আরবেলোয়া—রিয়ালের ডাগআউটে আসা প্রতিটি কোচের জন্যই সবচেয়ে বড় এবং অমীমাংসিত এক চ্যালেঞ্জ এটি। মাঠের প্রায় একই পজিশনে (লেফট উইং) খেলা এই দুই মহাতারকাকে কীভাবে একসঙ্গে খেলিয়ে দলের সেরাটা বের করে আনা যায়, সেই ফর্মুলা কেউই পুরোপুরি মেলাতে পারেননি।
অবশ্য যদি পরিসংখ্যানের খেরোখাতা দেখা হয়, তবে আনচেলত্তি এই ভারসাম্য বজায় রাখার কঠিন কাজটা বেশ ভালোভাবেই সামলেছিলেন। গত মৌসুমে ৪৪ গোল করে এমবাপ্পে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সিজন উপহার দিয়েছিলেন, জিতেছিলেন পিচিচি ট্রফি এবং ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু-ও। অন্যদিকে ভিনিসিয়ুসও ২২ গোল এবং ১৬ অ্যাসিস্ট করে নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু মাঠের খেলায় দুই তারকার এই বিশাল পরিসংখ্যান রিয়ালের জন্য খুব একটা কাজে আসেনি; মৌসুমের শুরুতে উয়েফা সুপার কাপ এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ ছাড়া বড় কোনো শিরোপাই ঘরে তুলতে পারেনি লস ব্লাঙ্কোসরা।
চলতি ভিনি-এমবাপের পারফরম্যান্স যেন অনেকটা পেন্ডুলাম বা দোলনার মতো ওঠানামা করেছে। জাবি আলোনসোর অধীনে যেখানে এমবাপে ছিলেন দুর্দান্ত, সেখানে আরবেলোয়ার ছোঁয়ায় ভিনিসিয়ুস ফিরে পেয়েছেন নিজেকে। লেভারকুসেনের সাবেক কোচ আলোনসোর অধীনে ২৬ ম্যাচে ৩১ গোল করে রীতিমতো উড়ছিলেন এমবাপ্পে। কিন্তু ডাগআউটে পরিবর্তনের পর, চোটের ধাক্কা সামলে ১৮ ম্যাচে তিনি করতে পেরেছেন মাত্র ১২ গোল।
অন্যদিকে আরবেলোয়া যখন রিয়ালের দায়িত্ব নেন, তখন ভিনিসিয়ুসের অবস্থা ছিল একেবারেই যাচ্ছেতাই। সাবেক কোচের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো আর বার্নাব্যুর দর্শকদের দুয়ো শোনা ভিনিসিয়ুস ২৭ ম্যাচে করেছিলেন মাত্র ৬ গোল, এমনকি কাটিয়েছেন তিন মাসের দীর্ঘ গোলখরাও! তবে আরবেলোয়ার অধীনে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়ান এই ব্রাজিলিয়ান; ২৫ ম্যাচে করেন ১৫ গোল। মরিনিয়োর আসল চ্যালেঞ্জটাই হবে এমন এক জাদুকরী ফর্মুলা খুঁজে বের করা, যা কোনো খেলোয়াড়কে হতাশ না করে একইসঙ্গে দুজনেরই সেরা সংস্করণটা মাঠে ফুটিয়ে তুলবে।
দলবদলের অগ্রাধিকার ও নতুন মুখ চিহ্নিত করা
রিয়াল মাদ্রিদ এবার গত ছয় বছরের মধ্যে তাদের সবচেয়ে ব্যস্ত এবং ব্যয়বহুল দলবদলের মৌসুম পার করেছে। তবে এত খরচ করে যে চারজন নতুন খেলোয়াড়কে তারা দলে ভিড়িয়েছিল, তাদের প্রত্যেকেই শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। আলভারো কারেরাস, ডিন হাইসেন এবং ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুওনো—তিনজনেই শুরুতে দারুণ ঝলক দেখালেও সময়ের গড়ানোর সঙ্গে ফিকে হয়ে গেছেন। অন্যদিকে ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড কেবল চোটের সঙ্গেই লড়াই করেননি, মাঠে রিয়ালের রক্ষণভাগের দুর্বলতাগুলোকেও বড্ড নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
ঐতিহ্যগতভাবেই রিয়াল মাদ্রিদ দলবদলের বাজারে খুব দ্রুত চাল চালতে পছন্দ করে, তবে এই গ্রীষ্মে তাদের সেই তাড়াহুড়ো আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। কারণ সামনেই কড়া নাড়ছে ফুটবল বিশ্বকাপ; আর উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বমঞ্চে যে তারকারাই নিজেদের আলো ছড়াবেন, তাদের দাম যে আকাশচুম্বী হয়ে যাবে তা বলাই বাহুল্য। তাই বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই দলের খামতিগুলো বুঝে সঠিক খেলোয়াড় বেছে নেওয়া মরিনিয়োর জন্য হবে অনেক বড় এক চ্যালেঞ্জ।

গত দুই দশকে ফুটবলবিশ্ব বুঁদ হয়ে আছে মেসি-রোনালদো দ্বৈরথে। পায়ের জাদুতে রেকর্ডবই তছনছ করা কিংবা ট্রফি জয়ের আকাশচুম্বী সাফল্য—দুই কিংবদন্তিই ফুটবলকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়। একে অপরকে টপকে যাওয়ার এই মহাকাব্যিক লড়াই কেবল ট্রফি জয়ের আনন্দেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রেকর্ড গড়ার এই অনন্ত যাত্রায় মাঠের সাফল্য যেমন তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়েছে, তেমনি ফাইনাল হারের চরম হতাশার গল্পেও তারা একে অপরের চিরসাথী। ক্যারিয়ারের অসংখ্য সোনালী ট্রফি জয়ের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি অর্থাৎ ফাইনাল হারের অনাকাঙ্ক্ষিত তালিকাতেও এই দুই ফুটবল ঈশ্বর একে অপরের গা ঘেঁষে অবস্থান করছেন।
গত শনিবার আল নাসরের সামনে সুযোগ ছিল এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু-এর শিরোপা নিজেদের করে নেওয়ার। মহাদেশীয় টুর্নামেন্টের (এএফসি) ফাইনালে জাপানের ক্লাব গাম্বা ওসাকার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে আল নাসরের। আর এই হারের ফলে ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি ফাইনাল ম্যাচ হারার রেকর্ডে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসিকে আবারও ছাড়িয়ে গেলেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।
আরও পড়ুন
| সিলেটে চতুর্থ ইনিংসে পাকিস্তানকে বড় চ্যালেঞ্জে ফেলার আবহ |
|
২০০২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পেশাদার ক্যারিয়ারে ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবল মিলিয়ে পর্তুগাল অধিনায়ক রোনালদোর ফাইনালে হারের সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ১৫টিতে। অন্যদিকে, ২০০৪ থেকে শুরু হওয়া ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত ১৩টি ফাইনালে রানার্স-আপ হয়ে রোনালদোর ঠিক পেছনেই আছেন লিওনেল মেসি।
ক্যারিয়ারের প্রথম ফাইনালেই হারের তিক্ত স্বাদ পেয়েছিলেন ‘সিআরসেভেন’। ২০০৩ সালে পর্তুগিজ কাপের সেই ফাইনালে সাবেক ক্লাব স্পোর্টিং সিপির হয়ে পোর্তোর কাছে হেরেছিলেন। এর ঠিক এক বছর পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি খান এই ফরোয়ার্ড। ঘরের মাঠে গ্রিসের কাছে ইউয়েফা ইউরো ২০০৪- ফাইনালে হেরে অশ্রুসজল চোখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তরুণ রোনালদোকে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রথম মেয়াদেও রেড ডেভিলসদের জার্সিতে তিনটি ফাইনাল হেরেছিলেন রোনালদো। যার মধ্যে দুটি ছিল এফএ কাপের ফাইনাল; ২০০৫ সালে আর্সেনাল এবং ২০০৭ সালে চেলসির বিপক্ষে। তবে ওল্ড ট্রাফোর্ডের দিনগুলোতে তাঁর সবচেয়ে বেদনাদায়ক পরাজয়টি এসেছিল ২০০৮-০৯ মৌসুমের ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে, যেখানে লিওনেল মেসির বার্সেলোনার কাছে হেরে শিরোপাস্বপ্ন ভেঙেছিল রোনালদোর।
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে রোনালদোর সময়টা রূপকথার মতো কাটলেও, কিছু কঠিন পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ পাওয়া থেকে রেহাই পাননি তিনি। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সেই সোনালী সময়ে কোপা দেল রে এবং স্প্যানিশ সুপার কাপ মিলিয়ে মোট চারটি ফাইনাল হেরেছিলেন এই মহাতারকা। যার মধ্যে দুটি ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার বিপক্ষে, আর বাকি দুটি মাদ্রিদ ডার্বিতে আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে।
২০১৮ সালে স্প্যানিশ পরাশক্তিদের ডেরা ছেড়ে রোনালদো পাড়ি জমান ইতালিয়ান জায়ান্ট জুভেন্টাসে। তুরিনের বুড়িদের হয়ে পাঁচটি শিরোপা জিতলেও, সেখানেও দুটি ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাঁর। প্রথমটি ২০১৯ সালের ইতালিয়ান সুপার কাপে লাৎসিওর বিপক্ষে এবং দ্বিতীয়টি ২০২০ সালের কোপা ইতালিয়ার ফাইনালে নাপোলির কাছে।
আল নাসরেও কাটছে না রোনালদোর ফাইনাল ভাগ্য
গাম্বা ওসাকার বিপক্ষে এই পরাজয় রোনালদোর সাম্প্রতিক ট্রফিহীন যাত্রার এক হতাশাজনক অধ্যায়কেই যেন দীর্ঘায়িত করল। ২০২৩ সালের শুরুতে আল নাসরে যোগ দেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ক্লাবটির হয়ে কোনো অফিসিয়াল শিরোপা জিততে পারেননি। রোনালদোর বর্ণাঢ্য ক্লাব ক্যারিয়ারে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘতম ট্রফি খরা।
সৌদি আরবের মাটিতে এই সাড়ে তিন বছরে রোনালদো যে চারটি ফাইনাল খেলেছেন, তার প্রতিটিতেই তাঁকে রানার্স-আপ হয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে। গত শনিবারের এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু-এর ফাইনাল ট্র্যাজেডির আগে সৌদি সুপার কাপে আল হিলাল ও আল আহলি এবং কিংস কাপের ফাইনালে আল হিলালের কাছেই শিরোপা হারিয়েছিল রোনালদোর আল নাসর।
লিওনেল মেসির ফাইনাল ট্র্যাজেডি
শিরোপার সংখ্যার বিচারে রোনালদোর চেয়ে বেশ বড় ব্যবধানেই এগিয়ে আছেন লিওনেল মেস।। যেখানে রোনালদোর ট্রফি ৩৫টি, সেখানে আর্জেন্টাইন জাদুকরের শোকেসে জমা হয়েছে রেকর্ড ৪৮টি ট্রফি। আর শিরোপা জয়ের এই আধিপত্যের প্রতিফলন দেখা যায় দুই মহাতারকার ফাইনাল হারের সংখ্যাতেও; যেখানে রোনালদোর চেয়ে কম ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে ‘এলএমটেনের’।
আরও পড়ুন
| বিশ্বকাপে আকাশ ছোঁয়ার অপেক্ষায় একঝাঁক তরুণ তুর্কি |
|
ক্যারিয়ারে রোনালদো যেখানে ১৫টি ফাইনালের মঞ্চে হেরেছেন, মেসির ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ১৩। এর মধ্যে বার্সেলোনার জার্সিতে কোপা দেল রে, স্প্যানিশ সুপার কাপ এবং ইউয়েফা সুপার কাপ মিলিয়ে আটটি ফাইনালে রানার্স-আপ হয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ীকে।
বাকি পাঁচটির মধ্যে চারটিই এসেছে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে, যা মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেই মহাকাব্যিক ফাইনাল ছাড়াও ২০০৭, ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে ট্রফি তুলতে পারেননি ইন্টার মায়ামির তারকা। মেসির ক্যারিয়ারের সর্বশেষ ফাইনাল হারটি এসেছে মায়ামির জার্সিতে; ২০২৩ সালের ইউএস ওপেন কাপের ফাইনালে হিউস্টন ডায়নামোর কাছে হেরেছিল মেসির দল।

ফ্রেঞ্চ লিগ আঁ-তে গতকাল নঁতে ও তুলুজের ম্যাচ শুরুর মাত্র ২২ মিনিটের মাথায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ঘরের মাঠের ক্লাবের উগ্র সমর্থকরা (আল্ট্রাস) গ্যালারি থেকে মাঠে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ার পাশাপাশি একের পর এক ফ্লেয়ার (আতশবাজি) ছুড়তে থাকলে এই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পুরো মৌসুমজুড়ে দলের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের কারণেই মূলত ক্ষোভ উগরে দেন স্বাগতিক নঁতের সমর্থকরা। চলতি মৌসুমে ৩৩ ম্যাচের মধ্যে মাত্র ৫টিতে জয় পাওয়ায় ইতিমধ্যেই লিগ ওয়ানের শীর্ষ স্তরের ফুটবল থেকে অবনমন () নিশ্চিত হয়ে গেছে নঁতের। ২০১৩ সালে লিগ ওয়ানে ফেরার পর এই প্রথম ক্লাবটিকে অবনমনের তিক্ত স্বাদ পেতে হলো।
ম্যাচের আগেই অবশ্য নঁতের রেলিগেশন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। ফলে ক্ষুব্ধ সমর্থকরা লিগের শেষ দিনটিকে বেছে নিয়েছিলেন ক্লাবের ওপর নিজেদের চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশের মঞ্চ হিসেবে। ম্যাচের স্কোরলাইন যখন গোলশূন্য, ঠিক তখনই 'স্তাদ দে লা বোজোয়ার'-এর গ্যালারিতে নঁতের সমর্থকেরা ফ্লেয়ার জ্বালাতে শুরু করেন। এর কিছুক্ষণ পরই শত শত আল্ট্রাস সমর্থক নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে হুড়মুড় করে মাঠের দিকে ধেয়ে আসেন।
আরও পড়ুন
| বিশ্বকাপ দল ঘোষণার আগের দিন মারাত্মক ভুলের শিকার নেইমার |
|
স্টেডিয়ামের নিরাপত্তাকর্মীদের বাধা টপকে বিক্ষোভকারীদের অনেকেই মাঠের ভেতরে ঢুকে পড়লে দুই দলের খেলোয়াড়রা নিজেদের সুরক্ষায় দ্রুত দৌড়ে টানেল দিয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে চলে যান। এমন পরিস্থিতিতে ফরাসি পুলিশ দ্রুত মাঠে নেমে টানেলের মুখ আটকে দেয়, যাতে কোনো খেলোয়াড় বা স্টাফের ক্ষতি না হতে পারে।
মাঠের এই রণক্ষেত্রে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়, যখন নঁতের ম্যানেজার ভাহিদ হালিলহদজিচকে ক্ষুব্ধ আল্ট্রাসদের সঙ্গে কথা বলতে যাওয়ার সময় জোর করে টেনে ধরে রাখা হয়েছিল। নিজের চোখের সামনে ক্লাবের এমন ধ্বংসাত্মক রূপ দেখে এই বসনিয়ান কোচ তখন প্রায় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। গত মার্চে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্লাবের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল ৭৪ বছর বয়সী এই কোচের ডাগআউটে শেষ ম্যাচ।
খেলোয়াড়ি জীবনে নঁতের হয়ে ৫ বছর কাটিয়েছিলেন হালিলহদজিচ; এর আগে ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দলটির ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি। প্রিয় ক্লাবকে রেলিগেশনের হাত থেকে বাঁচাতে অবসর ভেঙে আবারও ডাগআউটে ফিরেছিলেন এই বর্ষীয়ান কোচ। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না; টেবিলের ১৭ নম্বরে থেকে লিগ শেষ করায় নঁতের ভাগ্য বদলাতে পারেননি তিনি।
মাঠে দর্শকদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশের কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য আল্ট্রাসদের মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে ম্যাচ প্রথমবার স্থগিত হওয়ার প্রায় ৪০ মিনিট পর রেফারি স্টেফানি ফ্র্যাপার্ট শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তাজনিত কারণেই ম্যাচটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
এদিকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নঁত ক্লাব কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘কোচ ভাহিদের বিদায়ী ম্যাচ এবং নিজেদের আত্মসম্মানের স্বার্থে 'ইয়েলো অ্যান্ড গ্রিন্স'রা (নঁত) আজ রাতে বোজোয়ার স্টেডিয়ামে তুলুজ এফসির বিপক্ষে জয় দিয়ে মৌসুম শেষ করতে চেয়েছিল।’
আরও পড়ুন
| বিশ্বকাপে আকাশ ছোঁয়ার অপেক্ষায় একঝাঁক তরুণ তুর্কি |
|
বিবৃতিতে ক্লাবটি আরও যোগ করে, ‘তবে গ্যালারিতে আতশবাজি ফোটানো এবং ২২ মিনিটে (০-০ স্কোরলাইনে) মাঠে দর্শকদের অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশের কারণে, প্রশাসন এবং ম্যাচ রেফারি প্যানেল খেলাটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয়।’
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ফ্রান্সের ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি। তিনি লিখেছেন, ‘আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এই সহিংস কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। পাশপাশি খেলোয়াড় এবং যেসব সাধারণ সমর্থক মাঠে খেলা উপভোগ করতে এসেছিলেন, তাঁদের প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি।’
চলতি মাসের শুরুর দিকেই লঁসের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে নঁতের লিগ টু-তে (দ্বিতীয় স্তর) নেমে যাওয়া নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। অথচ মাত্র চার বছর আগেই নিজেদের ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো ‘কোপ দে ফ্রান্স’ (ফরাসি কাপ) জিতেছিল এই ক্লাবটি, এমনকি তার পরের মৌসুমেও তারা এই টুর্নামেন্টের রানার্স-আপ হয়েছিল। সেই সোনালী অতীত ভুলে চার বছরের মাথায় ক্লাবটির এমন পতন সমর্থকেরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।

বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বমঞ্চে নতুন নক্ষত্রের উদয়। যেখানে তরুণ প্রতিভারা রাতারাতি রূপ নেন বৈশ্বিক আইকনে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ শুরুর আগে ফুটবল বিশ্বের চোখ এখন এমন কিছু তরুণ তুর্কির দিকে, যারা আসর কাঁপাতে পুরোপুরি প্রস্তুত। পেলের উত্থান থেকে শুরু করে কিলিয়ান এমবাপের বিশ্বজয়—ফুটবলের এই মঞ্চ বরাবরই অচেনা তরুণদের কিংবদন্তি বানানোর কারিগর। এবারও বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াতে এবং উত্তর আমেরিকার সবুজ গালিচায় নিজেদের নাম ইতিহাসের পাতায় অমর করে রাখার স্বপ্নে বিভোর একঝাঁক ‘ওয়ান্ডারকিড’।
নিকো পাজ: আর্জেন্টিনার নতুন ‘ম্যাজিশিয়ান’
সাবেক আর্জেন্টাইন ফুটবলার পাবলো পাজের ছেলে নিকো পাজ। স্পেনে জন্ম ও বেড়ে উঠলেও পাজ বেছে নিয়েছেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সি। রিয়াল মাদ্রিদ একাডেমির এই চমৎকার সৃষ্টি গত দুই বছর ধরে ইতালিয়ান ক্লাব কোমোতে সেস ফ্যাব্রিগাসের অধীনে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। মাত্র ২১ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের পারফরম্যান্স দেখে রিয়াল মাদ্রিদ ইতিমধ্যেই তাদের 'বাইব্যাক ক্লজ' ব্যবহার করে তাঁকে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দুর্দান্ত টেকনিক্যাল স্কিল আর দূরপাল্লার শটে গোল করার সহজাত ক্ষমতার কারণে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর নজর এখন পাজের ওপর। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি যখন কিংবদন্তি লিওনেল মেসির ওয়ার্কলোড বা খেলার সময় ম্যানেজ করার কথা ভাবছেন, তখন মেসির সেই শূন্যস্থান পূরণের কঠিন কিন্তু রোমাঞ্চকর দায়িত্বটা পড়তে পারে পাজের কাঁধেই।
দেসিরে দুয়ে: ফরাসি আক্রমণের নতুন অস্ত্র
মাত্র ২০ বছর বয়সী দেসিরে দুয়ে ইতিমধ্যেই ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। গত বছর প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) জার্সিতে ইন্টার মিলানকে গুঁড়িয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে জোড়া গোলসহ জিতেছিলেন ম্যাচসেরার পুরস্কার। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের কোনো বড় টুর্নামেন্টে এটাই হতে যাচ্ছে ফরাসি এই তরুণের প্রথম অভিজ্ঞতা।
কিলিয়ান এমবাপে, ব্যালন ডি'অর জয়ী উসমান দেম্বেলে কিংবা বায়ার্ন মিউনিখের মাইকেল অলিসের মতো তারকাখচিত ফরাসি আক্রমণভাগে শুরুর একাদশে জায়গা পাওয়াটা দুয়ের জন্য একরকম যুদ্ধই বলা চলে। তবে কোচ দিদিয়ের দেশমকে নিজের সামর্থ্যের জানান দিতে ভুল করেননি তিনি। গত মার্চে কলম্বিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ৩-১ ব্যবধানের জয়ের রাতে জোড়া গোল করে দলে নিজের জোরালো দাবি জানিয়ে রেখেছেন এই পিএসজি তারকা।
বিশ্বকাপের ট্রফি ধরে রাখার মিশনে আর্জেন্টিনার নিকো পাজ কিংবা মুকুট পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে ফ্রান্সের দেজিরে দুয়ে—এই দুই তরুণের কেউ একজন যদি ২০২৬ বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান তারকা হয়ে যান, তবে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না!
নিকো ও’রিলি: গার্দিওলার নতুন বাজি, ইংল্যান্ডের সমাধান
মাত্র ২১ বছর বয়সেই পেপ গার্দিওলার ভরসার পাত্র হয়ে ম্যানচেস্টার সিটির নিয়মিত মুখ বনে গেছেন নিকো ও’রিলি। গত মার্চে আর্সেনালকে হারিয়ে সিটির লিগ কাপ জয়ের ফাইনালে লেফট-ব্যাক পজিশন থেকে জোড়া গোল করেছিলেন এই তরুণ। অথচ ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ছিলেন একজন গোলস্কোরিং মিডফিল্ডার। ও’রিলির উচ্চতা, গতি এবং স্কিলের দারুণ মিশ্রণকে রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন গার্দিওলা। আর সেটাই হয়তো ইংল্যান্ডের নতুন কোচ টমাস টুখেলের একটা বড় সমস্যারও সমাধান করে দিয়েছেন এই মাস্টারমাইন্ড।
২০২৪ ইউরোতে অধিকাংশ ম্যাচেই ফিট লেফট-ব্যাক ছাড়া খেলতে হয়েছিল থ্রি-লায়ন্সদের, যার বড় কারণ ছিল লুক শর চোট। ও’রিলির এই উত্থানে ইংল্যান্ড এখন স্বস্তিতে। ও’রিলিকে নিয়ে গার্দিওলার মুগ্ধতাও কম নয়, ‘কী দারুণ একজন খেলোয়াড়! সে অবিশ্বাস্য এক ধাপ ওপরে উঠেছে। প্রচুর ম্যাচ খেলছে ঠিকই, তবে সে এটার যোগ্য।’
এন্ড্রিক: ফ্রান্সের মাটিতে পুনর্জন্ম, ব্রাজিলের রোমারিও হওয়ার স্বপ্ন
মাত্র ১৬ বছর বয়সে পালমেইরাসের হয়ে অভিষেক, আর ১৮ বছর ছোঁয়ার আগেই যাঁকে দলে ভিড়িয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ—সেই এন্ড্রিকের বিশ্বকাপ রাঙানোর স্বপ্নটা নতুন করে ডানা মেলেছে ফরাসি ক্লাব লিওঁতে ধারে খেলতে গিয়ে। দুই বছর আগে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে রোনালদো নাজারিওর পর ব্রাজিলের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন।
রিয়ালে যোগ দেওয়ার পর অবশ্য কিলিয়ান এমবাপে এবং ভিনিসিউস জুনিয়রের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যান ১৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড এন্দ্রিক। অবশেষে গত জানুয়ারিতে ফ্রান্সে পাড়ি জমানোর পর থেকেই আবার নিজের চেনা ছন্দ ফিরে পেয়েছেন তিনি। একটু খাটো অথচ শক্তিশালী গড়নের কারণে ব্রাজিলের আরেক কিংবদন্তি রোমারিওর সাথে প্রায়ই তুলনা করা হয় এন্ড্রিকের। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ৫ গোল করে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন রোমারিও। এবার ২০২৬ সালেও সেই মার্কিন মুলুকেই রোমারিওর সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করতে চাইবেন এই তরুণ সেলেসাও তারকা।
পেদ্রি: স্পেনের মাঝমাঠের ‘মেট্রোনম’, জাভির যোগ্য উত্তরসূরি
স্প্যানিশ ফুটবলের চিরচেনা পাসিং ফুটবলের নতুন ‘মেট্রোনম’ বা তালরক্ষক বলা যায় পেদ্রিকে। বার্সেলোনা এবং স্পেন জাতীয় দল—উভয় জায়গাতেই কিংবদন্তি জাভি হার্নান্দেজের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন এই মিডফিল্ডার। ২০২০ ইউরোতে মাত্র ১৮ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলের স্পটলাইটে এসেছিলেন মাঝমাঠের জাদুকর। এরপর দুই বছর আগে, স্পেনের ইউরোপ জয়ের মিশনেও তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। যদিও চোটের কারণে সেবার সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে মাঠে নামা হয়নি তাঁর।
বার্সেলোনার হয়ে অবশ্য কোচ হান্সি ফ্লিকের অধীনে নিজের চোটের সমস্যাকে পেছনে ফেলেছেন পেদ্রি। গত দুই মৌসুমে কাতালানদের টানা দুটি লা লিগা শিরোপা জয়ের পেছনে মাঝমাঠে মূল তারকার ভূমিকা পালন করেছেন এই স্প্যানিশ জিনিয়াস। ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের মাঝমাঠের পুরো নিয়ন্ত্রণটা যে তাঁর পায়েই থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।

লা লিগায় ঘরের মাঠে শতভাগ
জয়ের ইতিহাস গড়ার রাতে চোখের জলে স্পোটিফাই ক্যাম্প ন্যু-কে বিদায় জানালেন রবার্ট
লেভানডফস্কি। রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে পোলিশ এই মহাতারকাকে
দেওয়া হয় আবেগঘন এক বিদায় সংবর্ধনা। কাতালান ক্লাবটির জার্সিতে ঘরের মাঠে নিজের শেষ
ম্যাচটি খেলে ডাগআউটে ফেরার সময় অশ্রুসজল লেভানডফস্কি সমর্থকদের উদ্দেশ্যে জানিয়ে দেন,
স্টেডিয়ামকে বিদায় জানালেও বার্সেলোনাকে তিনি চিরকাল নিজের হৃদয়ে বহন করবেন।
ঘরের মাঠকে দূর্গ বানিয়ে
এই ম্যাচে লিগার ইতিহাসে এক অনন্য কীর্তি গড়ল বার্সেলোনা। স্প্যানিশ এই লিগে প্রথম
দল হিসেবে এক মৌসুমে ঘরের মাঠের সবকটি ম্যাচ জেতার রেকর্ড গড়ল কাতালান জায়ান্টরা। এর
আগে ১৯৮৪-৮৫ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ ৩৪ ম্যাচের লিগে ঘরের মাঠে সব ম্যাচ জিতলেও, ৩৮ ম্যাচের
পুরো মৌসুমে শতভাগ জয়ের রেকর্ড এবারই প্রথম দেখল স্প্যানিশ ফুটবল।
মৌসুমের এই ঐতিহাসিক শেষ
হোম ম্যাচের পুরো আলোটাই কেড়ে নিয়েছিলেন লেভানডফস্কি। ক্যাম্প ন্যু-তে নিজের শেষ ম্যাচ
খেলতে নামা এই পোলিশ ফরোয়ার্ডের হাতে ছিল অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। ম্যাচের ৮৫ মিনিটে
যখন তাঁকে তুলে নেওয়া হয়, তখন নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি, চোখ ফেটে জল আসে
এই মহাতারকার। ডাগআউটে যাওয়ার পরও বারবার বাইরে বেরিয়ে এসে সমর্থকদের হাত নেড়ে বিদায়
জানান।
ম্যাচ শেষে বার্সার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে লেভানডফস্কি বলেন,
‘এই ক্লাবের হয়ে খেলতে পারাটা আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের। গত চার বছরে আমরা দারুণ কিছু মুহূর্ত পার করেছি। আমি এই স্টেডিয়ামকে বিদায় জানাচ্ছি ঠিকই, তবে বার্সেলোনাকে চিরকাল আমার হৃদয়ে বহন করব। একবার যে বার্সা, সে চিরকালের জন্যই বার্সা।’
২০২২ সালে বার্সেলোনা যখন
ইতিহাসের অন্যতম চরম আর্থিক সংকট আর লিওনেল মেসির বিদায়ের ধাক্কায় দিকভ্রান্ত, ঠিক
তখনই বায়ার্ন মিউনিখ ছেড়ে ক্লাবের হাল ধরেছিলেন লেভানডফস্কি। কাতালানদের সেই কঠিনতম
সময়ে ত্রাতা হয়ে এসে গত চার বছরে দলকে তিনটি লা লিগাসহ মোট সাতটি ট্রফি জিতিয়েই মাঠ
ছাড়ছেন ৩৭ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড।
বার্সেলোনার হয়ে ১৯২ ম্যাচে
মাঠে নেমে ১৯৯টি গোল করেছেন 'গোলমেশিন' লেভানডফস্কি। গড়ে প্রতি ১১৮ মিনিটে একটি করে
গোল করার পাশাপাশি তাঁর নেওয়া শটের ২১.২৫ শতাংশই জালে জড়িয়েছে। ক্লাবের হয়ে তাঁর
গোলগুলোর মধ্যে লা লিগায় ১৩৩ ম্যাচে ৮২টি, চ্যাম্পিয়নস লিগে ৩৮ ম্যাচে ২৩টি, কোপা
দেল রে-তে ১২ ম্যাচে ৭টি, স্প্যানিশ সুপারকোপায় ৭ ম্যাচে ৬টি এবং ইউরোপা লিগে ২ ম্যাচে
১টি গোল রয়েছে।
লেভানডফস্কিকে সম্মান জানাতে
অধিনায়কের আর্মব্যান্ড দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সকালেই নিয়েছিলেন রাফিনিয়া, আরাউহো ও পেদ্রিরা।
রাফিনিয়া জানান, ‘তাঁর ক্যারিয়ারের এমন একটি মুহূর্তের সঙ্গী হতে পারাটা সত্যিই সম্মানের।
আসার পর থেকেই ক্লাবের জন্য তিনি অনেক অবদান রেখেছেন।’
লেভানডফস্কির বিদায় ছুঁয়ে গেছে বার্সা ড্রেসিংরুম থেকে ডাগআউটেও। বায়ার্ন মিউনিখের পর বার্সেলোনা—ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় এই পোলিশ স্ট্রাইকারকে খুব কাছ থেকে দেখা কোচ হান্সি ফ্লিকও ম্যাচ শেষে প্রিয় শিষ্যের বিদায়লগ্নে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি,
‘রবার্টের একটা গোল হলে রাতটা হয়তো পুরোপুরি নিখুঁত হতে পারত, তাই বলা যায় রাতটা ছিল প্রায় নিখুঁত। আমি তাঁর সাথে বহু বছর কাজ করেছি এবং সে আমার একজন ভালো বন্ধু। বার্সেলোনা এবং এই ক্লাবের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন এক মুহূর্ত। আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। সে একাধারে একজন অসাধারণ মানুষ এবং বিশ্বমানের খেলোয়াড়। সে আমাদের দুর্দান্ত সব মুহূর্ত, গোল এবং শিরোপা উপহার দিয়েছে। আমরা তাঁকে খুব মিস করব, তবে এটাই জীবন এবং ফুটবলের নিয়ম। আমরা সবাই তাঁকে মিস করব, সে সত্যিই একজন ভালো মানুষ।’
ঘরের মাঠে শেষ ম্যাচ খেললেও
বার্সেলোনার জার্সিতে লেভানডফস্কির চূড়ান্ত বিদায় এখনই হচ্ছে না। আগামী শনিবার লা লিগার
শেষ ম্যাচে ভালেন্সিয়ার বিপক্ষে তাদের মাঠে বার্সার হয়ে ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি খেলতে
নামবেন তিনি।
এর আগে মাঝ সপ্তাহে আলাভেসের
কাছে হেরে যাওয়া ম্যাচের একাদশে বেশ কিছু পরিবর্তন আনেন বার্সা কোচ হান্সি ফ্লিক। জোয়ান
গার্সিয়া, পেদ্রি এবং রাফিনিয়াকে ফিরিয়ে আনা হয় শুরুর একাদশে। লেভানডফস্কির বিদায়ী
ম্যাচে বার্সাকে প্রথমে লিড এনে দেন ব্রাজিলিয়ান তারকা রাফিনিয়াই। বেতিস গোলকিপার আলভারো
ভালিসকে পরাস্ত করে দূরপাল্লার শটে বল জালে জড়ান তিনি।
১-০ ব্যবধানে প্রথমার্ধ
শেষ হওয়ার পর ম্যাচের ৬২ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন রাফিনিয়া। হেক্টর বেলেরিনের এক
ভুল পাস ধরে নিজের এবং দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন এই উইঙ্গার। তবে এর কিছুক্ষণ পরেই ম্যাচে
ফেরে বেতিস। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামা ইসকোকে বার্সার ডি-বক্সের ভেতর গাভি ফাউল
করলে পেনাল্টি পায় বেতিস। সফল স্পট কিকে ব্যবধান ২-১ করেন ইসকো নিজেই।
৭৪ মিনিটে স্বস্তি ফেরান
জোয়াও কানসেলো। তাঁর দূরপাল্লার দুর্দান্ত এক শট বেতিস গোলকিপারকে ফাঁকি দিয়ে জালে
জড়ালে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় বার্সেলোনার।