
হোয়াংহো নদী যেমন চীনের দুঃখ, তেমনি চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সেলোনার জন্য এক মূর্ত অভিশাপ দিয়েগো সিমিওনে। ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল নিয়েও ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্যের প্রতিযোগিতায় সিমিওনের আতলেতিকো মাদ্রিদের সামনে এসে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে বার্সাকে। তর্কাতিতভাবে সর্বকালের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির হৃদয় যেমন ভেঙেছেন সিমিওনে, তেমনি বর্তমানের অন্যতম সেরা লামিনে ইয়ামালকেও দেখতে হলো বিদায়ের বিষাদ। বার্সার ভিন্ন ভিন্ন দুই যুগের এই তারকাকে বিদায় করে তাই বাধ ভাঙা আবেগে ভাসছেন সিমিওনে।
গতকাল বার্সেলোনাকে দুই লেগ মিলিয়ে হারিয়ে ২০১৭ সালের পর প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালের টিকিটি কাটে আতলেতিকো মাদ্রিদ। দুই লেগ মিলিয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয়ের পর কোচ দিয়াগো সিমিওনে জানিয়েছেন, নিজের দলের এই লড়াকু মানসিকতা দেখে তিনি রীতিমতো 'আবেগপ্রবণ' হয়ে পড়েন।
মেট্রোপলিটানো স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালের দ্বিতীয় লেগের ম্যাচটিতে বার্সেলোনা ২-১ ব্যবধানে জিতেছে—গোল করেন লামিন ইয়ামাল, ফেরান তোরেস এবং আদেমোলা লুকমান। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে শেষ চারে যাওয়া সিমিওনের দল মুখোমুখি হবে আর্সেনাল অথবা স্পোর্টিং ক্লাবের বিপক্ষে।
সিমিওনের অধীনে এ নিয়ে চারবার (২০১৪, ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০২৬) চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে উঠল আতলেতিকো মাদ্রিদ। আর এই যাত্রায় তারা তিনবারই বিদায় করেছে শক্তিশালী বার্সেলোনাকে।
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সিমিওনে বলেন, ‘চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বার্সাকে ছিটকে দেওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়। আমরা লিওনেল মেসির বার্সার মুখোমুখি হয়েছি, ইয়ামালের বার্সার মুখোমুখি হয়েছি এবং দুইবারই আমরা তাদের হারিয়ে দেখিয়ে দিয়েছি।’
আরও পড়ুন
| নেইমারের বিশ্বকাপ ভাগ্য নিয়ে ব্রাজিল প্রেসিডেন্ট-আনচেলোত্তির আলোচনা |
|
আতলেতিকোতে নিজের ১৪ বছরের দীর্ঘ সফরের কথা মনে করিয়ে দিয়ে সিমিওনে আরও যোগ করেন, ‘দলের এই লড়াই করার ক্ষমতা দেখে আমি আজও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। অনেক খেলোয়াড় বদলেছে, আমরা বহুবার শূন্য থেকে শুরু করেছি, কিন্তু দিনশেষে আবারও আমরা ইউরোপের সেরা চারটি দলের একটি। চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে খেলা যে কতটা আনন্দের!’
আতলেতিকো মাদ্রিদের জয় উদযাপনের মাঝেই কোচ দিয়াগো সিমিওনে স্তুতি গাইলেন আতোয়ান গ্রিজম্যানের। এই গ্রীষ্মেই ক্লাব ছেড়ে এমএলএস-এর দল অরল্যান্ডো সিটিতে যোগ দিচ্ছেন এই ফরাসি তারকা। প্রিয় শিষ্যকে নিয়ে সিমিওনে বলেন, ‘সে একজন জিনিয়াস। সময় গেলেই আমরা উপলব্ধি করতে পারব যে আমাদের দলে ফুটবলের একজন জাদুকর ছিল—এমন একজন খেলোয়াড় যে তার অভিজ্ঞতা আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়। আমাদের সাথে তার যেটুকু সময় বাকি আছে, ঈশ্বর আর ভাগ্য যেন তাকে তার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে দেয়।’
সিমিওনের দলকে প্রায়ই 'ডিফেন্সিভ' বা রক্ষণাত্মক দল হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। কিন্তু কোচ দাবি করেছেন, বার্সেলোনাকে ছিটকে দেওয়ার পেছনে ছিল তাদের আক্রমণাত্মক মানসিকতা, ‘আমরা বছরের পর বছর ধরে নিজেদের পরিবর্তন করেছি। আমরা কী চাই, তা নিয়ে আমাদের মনে কোনো সংশয় নেই। সত্যি বলতে, আমরা ডিফেন্ড করার চেয়ে অ্যাটাক ভালো করি! তাই আমাদের আক্রমণ করতেই হবে, এছাড়া আর কোনো পথ নেই।’
No posts available.
১১ মে ২০২৬, ৫:১০ পিএম

রবার্ট লেভানডফস্কি স্বীকার করেছেন যে, আসন্ন গ্রীষ্মে বার্সেলোনা ছাড়লে তিনি অপেক্ষাকৃত ‘কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগে’ খেলার কথা বিবেচনা করবেন। পোলিশ স্ট্রাইকারকে নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে, মৌসুম শেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) যোগ দিতে পারেন।
লোয়ার লিগের জন্য দরজা খোলা
রোববার রাতে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে জিতে লিগ শিরোপা নিশ্চিত করে বার্সেলোনা। এরপর লেভানডফস্কি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ক্যাম্প ন্যু-তে তাঁর সময় ফুরিয়ে আসতে পারে। পোলিশ টেলিভিশন চ্যানেল ‘ইলেভেন স্পোর্টস’-এর সঙ্গে আলাপকালে অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার জানান, শারীরিকভাবে কম পরিশ্রমের কোনো লিগে গিয়ে পরিবেশ পরিবর্তনের বিষয়টি এখন বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা হিসেবে তাঁর টেবিলে রয়েছে।
লেভানডফস্কি ব্যাখ্যা করেন,
‘লোয়ার লিগে খেলার একটি অপশন থাকতে পারে। আমার বয়স এখন প্রায় ৩৮। কিন্তু শারীরিকভাবে আমি ভালো বোধ করছি, তাই আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবছি। আমাকে এই সম্ভাবনাটি মাথায় রাখতে হবে যে, এখন হয়তো খেলার পাশাপাশি জীবন উপভোগ করার সময় এসেছে। হয়তো সেই সুযোগটি আসবে এবং আমি এখনই তা উড়িয়ে দিচ্ছি না।’
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ফায়ারের মতো দলগুলোর সঙ্গে এর আগেও বেশ কয়েকবার তাঁর নাম জড়িয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
চুক্তির ক্ষণগণনা
আগামী মৌসুমেও লেভানডফস্কি বার্সেলোনা জার্সিতে থাকবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। শোনা যাচ্ছে, তাঁকে কম বেতনে চুক্তি বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন,
‘শরৎকালে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) আমি কী করব তা জানি না। আমি এইমাত্র জানলাম যে আমার চুক্তির আর মাত্র ৫১ দিন বাকি আছে, তাই আমার হাতে এখনও সময় আছে। আমি আরও কিছু প্রস্তাব শুনব এবং তারপর সিদ্ধান্ত নেব।’

সফল ক্যারিয়ারের ১৪ লিগ শিরোপা
গত রাতে এল ক্লাসিকোতে বদলি হিসেবে খেলতে নামা লেভানডফস্কি এই সুযোগে তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অর্জিত ট্রফিগুলোর দিকে ফিরে তাকান। বরুশিয়া ডর্টমুন্ড এবং বায়ার্ন মিউনিখের এই সাবেক তারকার কাছে শিরোপা জেতাটা এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যা তাঁকে পেশাদার ও ব্যক্তিগতভাবে তৃপ্তি দেয়। লেভানডফস্কি জোর দিয়ে বলেন,
‘আমি মোট ১৪টি লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছি এবং যেখানে খেলেছি প্রতিটি ক্লাবের হয়েই জিতেছি। এটি আমাকে খুব প্রভাবিত করে এবং আমি এটি নিয়ে গর্বিত।’
স্ট্যান্সনির মন্তব্যের জবাবে লেভানডফস্কি
স্বদেশী এবং বার্সেলোনার সতীর্থ ভয়চেক স্ট্যান্সনির সাম্প্রতিক পরামর্শটি হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন লেভানডফস্কি। স্ট্যান্সনি তাঁকে পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে অন্য ক্যারিয়ারের কথা ভাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বার্সার এই ‘নম্বর ৯’ তারকা হাসতে হাসতে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর মধ্যে এখনও ফুটবল খেলার যথেষ্ট শক্তি ও সামর্থ্য অবশিষ্ট আছে এবং এখনই অবসরের কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই।
লেভানডফস্কি বলেন,
‘আপনারা তো জানেনই ভয়চেক (স্ট্যান্সনি) কেমন। সে আজ এক কথা বলে তো কাল অন্য কথা। আমার অবস্থা এমন নয় যে আমি সকালে ঘুম থেকে উঠি আর শরীরে ব্যথা অনুভব করি। আমি বর্তমানে যেখানে আছি সেই জায়গাটিকে মূল্যায়ন করি এবং ফুটবল উপভোগ করি। ভবিষ্যতে কী হয় তা দেখা যাবে, তবে একটি বিষয় পরিষ্কার যে আমি খেলা চালিয়ে যাব।’

ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের তিনটির ফয়সালা হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। সবশেষ রবিবার ক্যাম্প ন্যুতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় এবং ২৯তম শিরোপা জিতেছে হান্সি ফ্লিকের দল। এই জয়ে নিষ্পত্তি হয়েছে লা লিগা ২০২৫-২৬ মৌসুম।
তিন ম্যাচ হাতে রেখেই লিগ ট্রফি শোকেসে তুলেছে বার্সেলোনা। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ১৪ পয়েন্ট এগিয়ে থাকায় পরবর্তী ম্যাচগুলো হয়ে উঠেছে কেবল নিয়মরক্ষার ম্যাচ। রিয়াল পরবর্তী তিন ম্যাচে জিতলে এবং বার্সেলোনা সবকটিতে হারলেও কাজের কাজ কিছুই হবে না।
ইউরোপের পাঁচ লিগের মধ্যে সবার আগে নিষ্পত্তি হয় বুন্দেসলিগার টাইটেল রেস। ১৯ এপ্রিল ঘরের মাঠে স্টুটগার্টকে ৪-২ গোলে উড়িয়ে ৩৫তম বারের মতো লিগ ট্রফি জিতে বাভারিয়ানরা। সর্বশেষ ১৪ মৌসুমেই ১৩ বার বুন্দেসলিগা চ্যাম্পিয়নের নাম বায়ার্ন। ব্যতিক্রম শুধু ২০২৩-২৪ মৌসুমটা, সবাইকে চমকে দিয়ে সেই মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল জাবি আলোনসোর বায়ার লেভারকুসেন।
একদিন আগে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বরুসিয়া ডর্টমুন্ড হেরে গেলে বায়ার্ন ও বুন্দেসলিগা শিরোপার দূরত্ব হয়ে যায় মাত্র ১ পয়েন্টের। সে সুযোগটা কাজে লাগায় ভিনসেন্ট কোম্পানির দল।
সপ্তাহখানেক আগে পার্মাকে ২-০ গোলে হারিয়ে সিরি’আ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইন্টার মিলান। ঘরের মাঠ সান সিরোতে পাওয়া জয়ে ইন্টার নিশ্চিত করেছে সিরি ‘আ’তে নিজেদের ২১তম শিরোপা, যা গত ছয় মৌসুমের মধ্যে তৃতীয়। সিরি ‘আ’তে ৩৬ শিরোপা নিয়ে সবার ওপরে আছে জুভেন্টাস। এরপরই ইন্টার, ১৯ শিরোপা নিয়ে তিনে এসি মিলান।
লিগ জেতা ইন্টারের সামনে এখন ইতিহাস গড়ার সুযোগও আছে। ১৩ মে রোমের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে কোপা ইতালিয়ার ফাইনালে লাৎসিওকে হারাতে পারলে ক্লাব ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো লিগ ও কাপ—দুই শিরোপাই একসঙ্গে জিতবে ক্লাবটি। সবশেষ ২০১১ সালে জোসে মরিনিওর কোচিংয়ে একই মৌসুমে সিরি ‘আ’ ও কোপা ইতালিয়া জিতেছিল ইন্টার।
গত বছর চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে পিএসজির কাছে ৫-০ গোলে পরাজয় এবং শেষ দিনে লিগ শিরোপা হারানোর গ্লানি ছিল নিরাজ্জুরি সমর্থকদের মনে। এবার সেটা হয়তো গোছাতে চলেছে ইন্টার।
বাকি রইল দুই: ইউরোপের সেরা পাঁচ লিগের মধ্যে সবচেয়ে জমজমাট প্রিমিয়ার লিগ। আপতদৃষ্টিতে আর্সেনাল শিরোপার ঘ্রাণ পেলেও ম্যানচেস্টার সিটি তাদের স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। গতরাতে ওয়েস্ট হ্যামের বিপক্ষে উৎকণ্ঠার এক জয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ে ৫ পয়েন্ট এগিয়ে গানারররা।
লিগে আর্সেনালের হাতে অবশিষ্ট দুই ম্যাচ। এই দুই ম্যাচে জয় থাকাটা অধিকতর নিরাপদ তাদের জন্য। ম্যানচেস্টার সিটির হাতে তিনটি ম্যাচ। এই তিনম্যাচে টানা জয় এবং মিকেল আরতেতার দলের হোঁচট পাশার দান উল্টে যেতে পারে!
লিগ আঁতে শীর্ষ দুই দলের ম্যাচ চারটি করে। পয়েন্ট টেবিলে লাঁসের চেয়ে ৬ পয়েন্ট এগিযে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। আর লিলেও তাদের পিছু পিছু। ৩৩ ম্যাচে ক্লাবটির পয়েন্ট ৬১। তারাও টিকে আছে লড়াই। এক্ষেত্রে যদি-কিন্তুটা বড় প্রয়োজন।
ট্রফি হাতছাড়া হতে পারে পিএসজিরও। পরবর্তী চার ম্যাচে একাধিক ম্যাচে অঘটন কিংবা লাঁসের টানা সাফল্য ফল উল্টো হতে পারে।
তিন দিন পর শীর্ষের দুই দল একে অন্যের মুখোমুখি হবে। এই ম্যাচের পর নির্ধারণ হয়ে যাবে শিরোপা ভাগ্য। পিএসজির হার কিংবা লাঁসের পূর্ণ তিন পয়েন্ট জন্ম দেবে নতুন গল্প।

ভিলা বেলমিরো স্টেডিয়ামটি যে নিজের প্রিয় আঙিনা সেটি আবারও প্রমাণ করলেন নেইমার। রেড বুল ব্রাগান্টিনোর বিপক্ষে সান্তোসকে ২-০ ব্যবধানে জিতিয়েছেন তিনি। গোল এবং অ্যাসিস্টে এই জয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাবেক বার্সেলোনা তারকা। একই সঙ্গে ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিল জাতীয় দলের চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন।
সান্তোসের জয়ে উজ্জ্বল নেইমার
কিংবদন্তি এই ফরোয়ার্ড আরও একবার দেখালেন যে ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা তাঁর এখনও ফুরিয়ে যায়নি। সান্তোসের জন্য রোববার রাতের ম্যাচটি ছিল বেশ চাপের। কিন্তু নেইমার তাঁর ফিনিশিং এবং প্লে-মেকিংয়ের জাদুতে ক্লাবের টানা ৭ ম্যাচের জয়হীন খরা কাটিয়ে তুলতে সাহায্য করেছেন।
প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে করা গোলটি ছিল নেইমার-সুলভ শৈলীর এক অনন্য প্রদর্শনী। বাম প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ শুরু উঠে বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েন, এরপর সতীর্থের সঙ্গে দ্রুত ও নিখুঁতভাবে বল দেওয়া-নেওয়া করে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে গোলকিপারকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। এই গোলটি সবাইকে আবারও মনে করিয়ে দিল কেন তিনি এখনও ব্রাজিলিয়ান ফুটবল সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় চরিত্র।
দ্বিতীয় গোলেও প্রধান ভূমিকা
নেইমারের প্রভাব কেবল গোল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ম্যাচের ৭৫ মিনিটে তিনি ছিলেন সেই কারিগর, যার ছোঁয়ায় ব্রাগান্টিনোর হাত থেকে ম্যাচটি পুরোপুরি ফসকে যায়। একটি নিখুঁত সেট-পিস থেকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তিনি বল বাড়ান আদানিস ফ্রিয়াসকে, যিনি জোরালো ফিনিশিংয়ে ব্যবধান ২-০ করেন। পুরো ম্যাচেই নেইমার ছিলেন দলের প্রধান চালিকাশক্তি। ৮২ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল বারবোসার পরিবর্তে মাঠ ছাড়ার আগে তিনি তিনটি লক্ষ্যে শট নেন এবং একটি ‘কি পাস’ দেন।
প্রিয় তারকার জন্য করতালিপূর্ণ বিদায়
ম্যাচ শেষ হওয়ার আগে নেইমার ও দর্শকদের মধ্যে এক আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয়। নেইমার যখন মাঠ ছেড়ে যাচ্ছিলেন, তখন পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানায়। ৩৪ বছর বয়সী তারকার জন্য দর্শকদের এই অভিবাদন ছিল স্পষ্ট এক সমর্থন বার্তা— সবাই চায় তিনি ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য জাতীয় দলে জায়গা করে নিন। গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট অর্জনের পর সান্তোস এখন তাদের পরবর্তী ব্যস্ত সূচির দিকে নজর দিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে কুরিটিবার বিপক্ষে দুটি ম্যাচ এবং সান লোরেঞ্জোর বিপক্ষে একটি মহাদেশীয় লড়াই।

রিয়াল মাদ্রিদকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার লা লিগার শিরোপা নিশ্চিত করেছে বার্সেলোনা। উৎসবের আবহের মাঝে আলোচনায় গাভি ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সেই উত্তপ্ত লড়াই। ম্যাচ চলাকালীন বেশ কয়েকবার তর্কে জড়িয়ে পড়েন এই দুই তারকা, যা এক পর্যায়ে চরমে পৌঁছায়।
বার্সেলোনার শিরোপা জয়ের আনন্দে যখন গ্যালারি মাতোয়ারা, তখন মাঠের ভেতরে রিয়ালের প্রাণভোমরা ভিনিসয়ুসের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করতে দেখা যায় গাভিকে। ম্যাচ শেষে গাভি বলেন, ‘ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে যা হয়েছে তা পুরোপুরি ফুটবলীয় বিষয়। মাঠে যা ঘটে, তা মাঠেই থাকা উচিত। সে কিছুটা মাথাগরম খেলোয়াড়, ঠিক আমার মতোই।’
মাঠে তর্কে জড়ালেও ভিনিসিয়ুসের ক্লাস নিয়ে কোনো সংসশয় নেই গাভির। প্রশংসা করে এই মিডফিল্ডার বলেন, ‘ভিনিসিয়ুস দুর্দান্ত একজন ফুটবলার। আমি শুধু তাকে তার মুখ বন্ধ রাখতে বলেছিলাম, এর বেশি কিছু নয়। মাঠের লড়াই আর মাঠের বাইরের জীবন সম্পূর্ণ আলাদা। পিচে আমি আমার দলের রঙ রক্ষায় জীবন বাজি রাখি। মাঠের বাইরে আমি একদমই অন্যরকম একজন মানুষ, যদিও সেটি দেখে সবসময় বোঝা যায় না।’
আরও পড়ুন
| 'আনলাইকলি ড্রিবল ডন' সার্জিও রামোস |
|
গাভি যখন কথার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলেন, ভিনিসিয়ুস তখন মাঠের ভেতরেই বার্সেলোনা সমর্থকদের দিকে ইঙ্গিত করে রিয়াল মাদ্রিদের বেশি সংখ্যক ইউরোপীয় শিরোপা জয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। হারের হতাশায় তখন বারবার মেজাজ হারাচ্ছিলেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড।
গাভির জন্য এই শিরোপা জয়টি ছিল অন্যরকম আবেগের। গত দুই বছর ধরে চোটে পড়ে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছেন তিনি। হাঁটুর গুরুতর সমস্যা কাটিয়ে আবার বার্সেলোনার মূল একাদশে জায়গা করে নেওয়াটা মোটেও সহজ ছিল না।
নিজের মানসিক শক্তি নিয়ে গাভি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত গত দুই বছরে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এই ধরনের বড় ইনজুরি থেকে ফিরতে মানসিক দৃঢ়তা খুব জরুরি। আমি আজ এই পর্যায়ে এসেছি শুধুমাত্র আমার মানসিক শক্তির কারণে। দীর্ঘ বিরতির পর এই গতিতে ফুটবল খেলা কঠিন, তবে আমি তা পেরেছি এবং আমি নিজেকে নিয়ে গর্বিত।’
হ্যান্সি ফ্লিক বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গাভিকে মাঝমাঠের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। জার্মান এই কোচের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গাভি বলেন, ‘কোচ আমার ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখেছেন। তিনি আমার প্রতিভা এবং মানসিকতা সম্পর্কে জানেন। ইনজুরি থেকে ফেরার পর আমাকে যে সুযোগ তিনি দিয়েছেন, তার জন্য আমি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব।’
লিগ শিরোপা জয়ের পর এখন গাভির লক্ষ্য জাতীয় দল। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে সব সময়ই গাভির ওপর আস্থা রেখেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে গাভি এখন পুরোপুরি প্রস্তুত, ‘জাতীয় দলের হয়ে খেলার সময় চোটে পড়েছিলাম। কোচ আমাকে সব সময় সমর্থন দিয়েছেন। এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং বিশ্বকাপের জন্য পুরোপুরি তৈরি।’

২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র ৩১ দিন বাকি। বিশ্বকাপে জ্বরে কাঁপছে পুরো বিশ্ব। ঠিক এই সময়ে ফিফা তাদের স্মৃতিভাণ্ডার থেকে তুলে আনল এমন এক অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান, যা ফুটবলপ্রেমীদের নতুন করে তর্কে মেতে ওঠার রসদ জুগিয়েছে। আজকের গল্পের নায়ক কোনো প্রথাগত ড্রিবলিং জাদুকর নন, বরং স্পেনের রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী- সার্জিও রামোস।
গল্পটা ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের। জোহানেসবার্গে সেই সোনালী ট্রফি জয়ের পথে স্পেন যেন এক অভেদ্য দুর্গ গড়ে তুলেছিল। রামোস তখন খেলতেন রাইট-ব্যাক হিসেবে। রক্ষণে তিনি কতটা ভয়ংকর ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে এক অনন্য রেকর্ডে—পুরো টুর্নামেন্টে স্পেন গোল হজম করেছিল মাত্র দুটি। এর আগে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্স, ২০০৬ বিশ্বকাপে ইতালি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে মাত্র দুই গোল হজমের যে রেকর্ড গড়েছিল, রামোসরা তাতে ভাগ বসিয়েছিলেন।
কিন্তু ২০১০ বিশ্বকাপে রামোস কেবল রক্ষণের দেয়াল হয়েই থাকেননি, তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক 'আনলাইকলি ড্রিবল ডন'। মাঠের পরিসংখ্যান বলছে, সেবার রামোস অবিশ্বাস্যভাবে ৩১টি ড্রিবল সম্পন্ন করেছিলেন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, মেসি, ইনিয়েস্তা বা রোবেনের মতো জাদুকরদের ছাপিয়ে সেবার রামোসই ছিলেন তালিকার শীর্ষে!
সেই তালিকায় রামোসের পেছনে ছিলেন লুকাস পোডলস্কি (২৭), আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা (২৬)। এমনকি সর্বকালের অন্যতম সেরা লিওনেল মেসি এবং ডেভিড ভিয়া (উভয়েই ২৫) কিংবা ডাচ উইঙ্গার আরিয়েন রোবেনও (২৪) রামোসের সেই ড্রিবলিং ঝড়ের কাছে নতিস্বীকার করেছিলেন। রক্ষণ সামলে একজন ডিফেন্ডার কীভাবে আক্রমণের ধার বাড়িয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ তছনছ করে দিতে পারেন, রামোস ছিলেন তার উদাহরণ।
পরবর্তী বিশ্বকাপগুলোতে ড্রিবলিংয়ের ব্যাটন অবশ্য পুরোপুরে চলে গেছে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের কাছে। ২০১৪ সালে লিওনেল মেসি, ২০১৮ সালে ইডেন হ্যাজার্ড আর ২০২২ বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপে ছিলেন ড্রিবলিংয়ের রাজা। কিন্তু একজন ডিফেন্ডার হয়েও রামোস যা করেছেন—একজন ডিফেন্ডার হিসেবে অসাধারণ কীর্তি।
২০২৬ বিশ্বকাপের এই ক্ষণগণনায় ফিফা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, ফুটবল মানেই অনিশ্চয়তা। আর একজন কট্টর রক্ষনভাগের খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারেন টুর্নামেন্টের সেরা ড্রিবলার।