২১ মে ২০২৬, ১০:৫০ পিএম

বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে উন্মাদনা এখনই তুঙ্গে। বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা বাড়ছে; কিন্তু শিরোপার আলোচনাটা ঘুরেফিরে সেই চিরচেনা ফেবারিটদের কেন্দ্র করেই। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে নিয়ে বরাবরের মতোই আকাশচুম্বী প্রত্যাশা, অন্যদিকে কাতার বিশ্বকাপ জিতে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দেওয়া লিওনেল মেসি ও তাঁর দল আর্জেন্টিনা এবারও নামছে হট-ফেবারিট হিসেবেই—যাদের ডেরায় হানা দেওয়া যেকোনো দলের জন্যই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
মেসি আর রোনালদোর সেই চিরন্তন দ্বৈরথ এখনো ফুটবলপ্রেমীদের বিতর্কের মূল জ্বালানি। তবে শিরোপার এই পথটা এবার মোটেও সহজ হবে না। একদিকে আছে একঝাঁক তরুণ তুর্কিতে ঠাসা ভয়ঙ্কর এক স্পেন দল, অন্যদিকে এলিট তারকার ছড়াছড়ি নিয়ে প্রস্তুত ফ্রান্স। নিজেদের হারিয়ে খোঁজা সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারে মরিয়া ব্রাজিল, আর দশকের পর দশক ধরে চলা ট্রফির খরা কাটাতে উন্মুখ ইংল্যান্ড। গ্রুপ পর্ব পেরোনোর পর নকআউটের লড়াইটা যে কতটা কঠিন আর জমজমাট হবে, তা নিয়ে বোদ্ধাদের ভবিষ্যৎবাণী এখনই ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।
নেইমার, মেসি এবং রোনালাদো : বিশ্বকাপে কি দেখা যাবে তাদের মুখোমুখি লড়াই?
কার্লো আনচেলত্তি এবং রবার্তো মার্তিনেজ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করার পর নেইমার ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর ভক্তরা উচ্ছ্বাসে ভাসছেন। তবে লিওনেল স্কালোনি এখনও আর্জেন্টিনা এবং মেসির জন্য চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেননি। অবশ্য ৫৫ সদস্যের প্রাথমিক তালিকায় নাম থাকায়, চূড়ান্ত স্কোয়াডে মেসির থাকাটা কেবলই সময়ের ব্যাপার।
আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং পর্তুগাল একে অপরের মুখোমুখি হতে পারবে না। যার অর্থ, গ্রুপ পর্বেই মেসি, নেইমার এবং ক্রিস্তিয়ানোর সরাসরি লড়াই দেখার কোনো সুযোগ নেই; যা হওয়ার তা নকআউট পর্বেই হতে হবে।
তবে ‘বোলাভিপ’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিজ নিজ গ্রুপে দলগুলো কীভাবে টুর্নামেন্ট শেষ করছে, তার ওপর ভিত্তি করে নকআউটের চূড়ান্ত মঞ্চে এই ঐতিহাসিক লড়াইগুলোর দুয়ার খুলে যেতে পারে।
গ্রুপ 'সি'তে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ মরক্কো, হাইতি এবং স্কটল্যান্ড। গ্রুপ 'জে'-তে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া এবং জর্ডান। আর গ্রুপ 'কে'-তে পর্তুগাল লড়াই করবে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, উজবেকিস্তান এবং কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে।
নকআউটের ব্র্যাকেট বা লাইন-আপ যেভাবে তৈরি হবে, তার ওপর নির্ভর করে নেইমার এবং লিও মেসির দেখা হয়ে যেতে পারে সেমিফাইনালে, অথবা সরাসরি ফাইনালে।
একই সমীকরণ খাটছে ‘সিআর সেভেন’ এবং নেইমারের ক্ষেত্রেও। টুর্নামেন্টের একেবারে শেষভাগ ছাড়া তাদের দেখা হওয়া সম্ভব নয়। যদি দুই দলই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে না পেরে পরের রাউন্ডে যায়, তবে শেষ ষোলোর মঞ্চেই তাদের দেখা হয়ে যেতে পারে। আর যদি দুই দলের যেকোনো একটি গ্রুপ রানার্স-আপ হয়, তবে তাদের মুখোমুখি লড়াইয়ের জন্য সেমিফাইনাল বা ফাইনাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
তবে যে লড়াইটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উন্মাদনা কাজ করছে, সেটি হলো এলএম টেন বনাম সিআর সেভেন দ্বৈরথ। ফুটবলপ্রেমীদের এই স্বপ্নের দ্বৈরথ বাস্তব রূপ নিতে পারে শেষ ষোলোর মঞ্চেই; যদি পর্তুগাল তাদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয় এবং আর্জেন্টিনা সেরা তৃতীয় দল হয়ে পরের রাউন্ডে কোয়ালিফাই করে।
যদি দুই দলই রানার্স-আপ (গ্রুপে দ্বিতীয়) হয়ে পরের রাউন্ডে যায়, তবে শেষ ষোলোর মঞ্চেই তাদের দেখা হয়ে যেতে পারে। তবে সবচেয়ে সম্ভাব্য সমীকরণটি মিলতে পারে কোয়ার্টার ফাইনালে; যদি আর্জেন্টিনা এবং পর্তুগাল—উভয় দলই নিজ নিজ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরবর্তী রাউন্ডের বাধা টপকাতে পারে।
এবারের বিশ্বকাপ কেবল ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টের নতুন একটি আসরই নয়, বরং ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা তিন কিংবদন্তির যৌথ বিদায়ের এক মহাকাব্যিক মঞ্চ। এখন দেখার বিষয়, ফুটবল বিধাতা তাদের ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে এসে মাঠের লড়াইয়ে আবারও মুখোমুখি দাঁড় করান কি না—সেই রোমাঞ্চকর প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে পুরো বিশ্ব।
No posts available.
২১ মে ২০২৬, ৬:২৫ পিএম
২১ মে ২০২৬, ৫:৩৫ পিএম

বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণা করেছে সেনেগাল। আর আফ্রিকার পরাশক্তির চমক—তেরাঙ্গা লায়নসদের ডেরায় সাদিও মানের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। মাত্র কয়েক মাস আগেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন এই সেনেগালের ফরোয়ার্ড। তবে সব গুঞ্জন উড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে কোচ পাপে থিয়াওয়ের দলে ঠিকই জায়গা করে নিয়েছেন এই গোলমেশিন।
২০২৫ সালের আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের (আফকন) এক বিতর্কের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন সাদিও মানে। তবে ‘তেরাঙা লায়নসদের’ বিপদে আবারও পাশে দাঁড়াতে সিদ্ধান্ত বদলেছেন আল-নাসরের এই ফরোয়ার্ড। ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে সেনেগালকে ভালো কিছু এনে দেওয়াই এখন এই মহাতারকার মূল লক্ষ্য।
সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াও এবার ফ্রান্স, নরওয়ে ও ইরাকের মতো কঠিন গ্রুপে পড়লেও দল নিয়ে বড় স্বপ্নই দেখছেন। মানে-র পাশাপাশি আক্রমণভাগকে শক্তিশালী করতে তিনি দলে রেখেছেন নিকোলাস জ্যাকসন, ইসমাইলা সার, ইলিমান এনদিয়ায়ে, আসানে দিয়াও এবং ইব্রাহিম এমবায়েদের মতো একঝাঁক প্রতিভাবান ফরোয়ার্ডকে।
ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোয় খেলা অভিজ্ঞ ও ভারসাম্যপূর্ণ এক স্কোয়াডের ওপরই ভরসা রাখছেন কোচ থিয়াও। এই দলে সবচেয়ে বড় চমক বায়ার্ন মিউনিখের তরুণ তুর্কি বারা সাপোকো এনদিয়ায়ে। জার্মান ক্লাবটির মূল দলের হয়ে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবেই ডাক পেয়েছেন এই উদীয়মান তারকা।
এছাড়া ফরাসি লিগ ওয়ানে খেলা লামিন কামারা, পাপে গেয়ে, মুসা নিয়াকাতে, ইয়েভান দিউফ ও মোরি দিয়াওদের মতো চেনা মুখগুলোও আছেন এই স্কোয়াডে। বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ক্যাম্পের জন্য কোচ আপাতত ২৮ সদস্যের দল ঘোষণা করলেও, মূল টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এই তালিকা থেকে দুজন বাদ পড়বেন।
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা বিশ্বকাপে ‘আই’ গ্রুপে লড়বে সেনেগাল। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হলো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, নরওয়ে এবং ইরাক। আগামী ১৬ জুন, ২০২৬ তারিখে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচ দিয়ে নিজেদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ‘তেরাঙা লায়নসরা’। এরপর ২২ জুন নরওয়ে এবং ২৬ জুন কানাডার মাটিতে ইরাকের মুখোমুখি হবে সাদিও মানের সেনেগাল।
সেনেগালের ২৮ সদস্যের বিশ্বকাপ দল :
গোলকিপার: এদুয়ার্দ মঁদি, মোরি দিয়াও, ইয়েভান দিউফ।
ডিফেন্ডার: ইসমাইল ইয়াকবস, এল হাদজি মালিক দিউফ, ক্রেপিন দিয়াত্তা, অঁতোয়ান মঁদি, কালিদু কুলিবালি, আবদুলাই সেক, মুসা নিয়াকাতে, মুস্তফা মবো, ইলাই কামারা, মামাদু সার।
মিডফিল্ডার: হাবিব দিয়ারা, পাপে মাতার সার, পাথে সিস, পাপে গেয়ে, লামিন কামারা, বারা সাপোকো এনদিয়ায়ে।
ফরোয়ার্ড: সাদিও মানে, ইসমাইলা সার, ইব্রাহিম এমবায়ে, আসানে দিয়াও, ইলিমান এনদিয়ায়ে, শেরিফ এনদিয়ায়ে, বাম্বা দিয়েং, নিকোলাস জ্যাকসন।

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছেন জার্মানির হেড কোচ জুলিয়ান নাগেলসমান। বৈশ্বিক ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের জন্য ঘোষিত এই দলের বড় আকর্ষণ গোলরক্ষক ম্যানুয়াল নয়্যার। ২০২৪ ইউরোর পর জাতীয় দলকে বিদায় জানিয়েছিলেন ৪০ বছর বয়সী বায়ার্ন মিউনিখ কিংবদন্তি। অবসর ভেঙে ফেরানো হয়েছে নয়্যারকে।
স্কোয়াডের অন্যান্যদের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন আফগান বংশোদ্ভূত জার্মান মিডফিল্ডার নাদিয়েম আমিরি। মেইনজে খেলা এই মিডফিল্ডারের ওপর ভরসা রেখেছেন নাগেলসম্যান। তরুণ মাক্সি বায়ারের পাশাপাশি কোচের আস্থা জিতেছেন লেরয় সানেও। জার্মানির জার্সিতে সানের সাময়িক ঝলকই তাকে দলে টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল।
অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নাথানিয়েল ব্রাউনকেও। এই রাইট-ব্যাককে নিয়ে কোচ নাগেলসমান মন্তব্য করেন, ব্রাউন সম্ভবত নিজেও জানেন না যে তিনি কতটা প্রতিভাবান। স্টুটগার্টের দুই তারকা অ্যাঞ্জেলো স্টিলার এবং জেমি লেভেলিংও চূড়ান্ত ২৬ জনের দলে ঠাঁই পেয়েছেন। লেভেলিংকে দলে নেওয়ার পেছনে তার ‘ওয়ান-অন-ওয়ান’ দক্ষতাকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন জার্মান কোচ।
ইনজুরির কারণে ২০২৫ সালের শুরুর দিক থেকে জার্মানির হয়ে কোনো ম্যাচ না খেললেও স্কোয়াডে রাখা হয়েছে জামাল মুসিয়ালাকে।
কপাল পুড়েছে নিকলাস ফুলক্রুগ, টম বিশফ এবং সাইদ আল মালার। চূড়ান্ত স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েছেন তারা। দলে জায়গা হয়নি ক্রিস ফুহরিখ এবং মাক্সি মিটেলস্টাটেরও।
ইউয়েফা ইউরো ২০২৪-এর সময় জার্মানির সংস্কৃতি ও বিভিন্ন অঞ্চলকে তুলে ধরে একটি সৃজনশীল বিপণন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দল ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে এবার অফিশিয়াল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কিছু ভিডিও প্রকাশ করা হয়। যেখানে চূড়ান্ত দলে থাকা ১২ জন খেলোয়াড়ের উদ্দেশ্যে তাদের পরিবার ও বন্ধুদের বার্তা এবং কোচ নাগেলসমানের অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
২০১৮ এবং ২০২২ সালের গত দুটি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব ও নকআউট পর্ব থেকে আকস্মিক বিদায়ের ধাক্কা সামলে, এবার বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষমঞ্চে নিজেদের পুরোনো গৌরব ফিরে পেতে মরিয়া 'ডি মানশাফট'।
চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির মূল লক্ষ্যই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর মাটিতে যৌথভাবে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টের শীর্ষস্থানটি পুনরুদ্ধার করা।
আসন্ন টুর্নামেন্টে 'ই' গ্রুপে খেলবে জার্মানি। যেখানে গ্রুপ পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকছে আইভরি কোস্ট, ইকুয়েডর এবং কুরাসাও।
২০২৬ বিশ্বকাপের জার্মানি স্কোয়াড:
গোলরক্ষক: ওলিভার বাউমান, ম্যানুয়াল নয়্যার, আলেকজান্ডার নুবেল।
রক্ষণভাগ: ভালদেমার আন্তন, নাথানিয়েল ব্রাউন, জশুয়া কিমিখ, ডেভিড রাউম, আন্তোনিও রুডিগার, নিকো শ্লটারবেক, জোনাথন তাহ, মালিক থিয়াও।
মিডফিল্ড: অ্যাঞ্জেলো স্টিলার, লেওন গোরেটস্কা, জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান ভির্টজ, আলেকজান্ডার পাভলোভিচ, পাসকাল গ্রোস, নাদিয়েম আমিরি, ফেলিক্স নমেচা।
আক্রমণভাগ: কাই হাভার্টজ, মাক্সিমিলিয়ান বায়ার, লেনার্ট কার্ল, জেমি লেভেলিং, লেরয় সানে, ডেনিজ উন্দাভ, নিক ভোল্টেমেড।

কাগজে-কলমে প্যারিস সেন্ট-জার্মেই (পিএসজি) ওই সময়টায় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ভয়ানক আক্রমণভাগ গড়ে তুলেছিল। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে এবং নেইমারকে নিয়ে গড়া এই ফ্রন্টলাইনকে প্যারিসের ক্লাবটিকে ঘিরে প্রত্যাশার পারদ আকাশ ছুঁয়েছিল। যদিও অবিশ্বাস্য প্রতিভা আর বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোড়ন তোলার পরও, মাঠের পারফরম্যান্সে সেই আকাশচুম্বী প্রত্যাশার সিকি ভাগও পূরণ করতে পারেনি এই ত্রয়ী। মহাতারকাদের এই মেলা শেষ পর্যন্ত একরাশ আক্ষেপেই রূপ নিয়েছিল।
এই ত্রয়ীকে সামলানোর দায়িত্বে ছিলেন সাবেক পিএসজি কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো। মেসি-েএমবাপে-নেইমার ত্রয়ী কেন পুরোপুরি সফল হতে পারল না, তার একটি চমৎকার ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি সম্প্রতি।
পচেত্তিনো বলেন,
‘তোমার কাছে লিওনেল মেসি আছে, যে কি না একদম রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণ তৈরি করতে পছন্দ করে। আবার কিলিয়ান এমবাপে আছে, যে খালি জায়গা খুঁজে নিয়ে সেখানে আক্রমণ চালাতে চায়। এখন আমরা যদি এমবাপের শক্তির ওপর ভরসা করে খেলি, তবে মেসি নিজের স্বাভাবিক খেলাটা মেলে ধরতে পারবে না। এর ওপর আবার নেইমারও আছে, যে স্বভাবতই বল পায়ে রেখে খেলতে ভালোবাসে। তবে এই পুরো পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময়টা পার করতে হয়েছে মিডফিল্ডারদের।’
পচেত্তিনোর এই মন্তব্য সেই সময়ের পিএসজি যুগের আসল সমস্যাটাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মাঠের তিন তারকাই ছিলেন বিশ্বসেরা, কিন্তু ফুটবলের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও খেলার ধরন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
মেসি সাধারণত একটু নিচে নেমে এসে বলের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ছোট ছোট পাসের কম্বিনেশনে বিল্ড-আপ করতে পছন্দ করতেন। অন্যদিকে, রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপে চাইতেন দ্রুত ট্রানজিশন আর প্রতিপক্ষের ফাঁকা জায়গায় সরাসরি তীব্র আক্রমণ। আর নেইমার খুঁজতেন বলের ছোঁয়া, মাঝমাঠ ও আক্রমণের মাঝে পজিশন আর বল পায়ে ড্রিবলিংয়ের স্বাধীনতা।
স্বাভাবিকভাবেই পুরো চাপটা গিয়ে পড়ত মিডফিল্ডের ওপর। একই কৌশলের মধ্যে এই তিনটি ভিন্ন ফুটবল দর্শনকে সুতোয় বাঁধার কঠিন দায়িত্বটা সামলাতে হতো তাদেরই।
ঘরোয়া ফুটবলের ট্রফিগুলো ঠিকই পিএসজির ক্যাবিনেটে এসেছিল, কিন্তু তাদের মূল স্বপ্ন—উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়—অধরাই থেকে গেছে।
এখন পেছনের দিকে তাকালে এই বৈপরীত্যটা বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর মেসি তার চেনা ছন্দ ফিরে পেয়েছেন, যেখানে পুরো দলের কাঠামো গড়ে উঠেছে আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে কেন্দ্র করেই। নেইমারও সান্তোসে ফিরে এসে নিজের প্রভাব দেখানোর মতো একটি সিস্টেমে দারুণ কিছু মুহূর্ত উপহার দিচ্ছেন। আর এমবাপে পাড়ি জমিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদে, যেখানে তারকাখচিত স্কোয়াডের মাঝেও তিনি নিয়মিত গোল করে যাচ্ছেন; যদিও দলগত সাফল্য এখনো প্রত্যাশার পারদ পুরোপুরি ছুঁতে পারেনি।
ঠিক বিপরীত চিত্র এখন প্যারিসে। তারকাকেন্দ্রিক ফুটবল থেকে বেরিয়ে এসে লুইস এনরিকের হাত ধরে এক অদম্য দল হয়ে উঠেছে পিএসজি। সাবেক বার্সা কোচের অধীনে গত মৌসুমে ঐতিহাসিক 'ট্রেবল' জয়ের স্বাদ পেয়েছিল ফরাসি জায়ান্টরা। এই মৌসুমে সেই চেনা ছন্দে ডাগআউট মাতানো এনরিকের দল একই কীর্তির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে নতুন ইতিহাস লেখার পথে দারুণভাবে এগিয়ে চলেছে।
এদিকে পচেত্তিনো এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের ডাগআউট সামলাচ্ছেন। চলতি বছরে আবারও ক্লাব ফুটবলে ফেরার গুঞ্জন শোনা গেলেও, আপাতত বিশ্বকাপ নিয়েই পুরোপুরি মনোযোগী হতে চান তিনি এবং এরপরই নিজের পরবর্তী ক্যারিয়ার নিয়ে ভাববেন।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হতে আর বাকি মাত্র ২২ দিন। তার আগে আঙুল ভেঙেছে আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজের।
বুধবার ইউরোপা লীগ ফাইনালে এসসি ফ্রাইবুর্গের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল অ্যাস্টন ভিলা। ইস্তাম্বুলের বেসিকতাস পার্কে নামার আগেই বড় ধাক্কা খায় ভিলা। ম্যাচ শুরুর আগের অনুশীলনের সময় আঙুল ভেঙে যায় মার্তিনেজের।
চোট পাওয়ার পরপরই মার্তিনেজ মাঠের পাশে গিয়ে ভিলার মেডিকেল টিমের কাছ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। এরপর আঙুলে বিশেষ টেপ পেঁচিয়েই মূল ম্যাচের জন্য মাঠে নেমে পড়েন।
চোট পেলেও মাঠের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারেনি মার্তিনেজের। পুরো ম্যাচে দুর্দান্ত কিছু সেভ করে জাল অক্ষত রাখেন এই বিশ্বকাপজয়ী গোলকিপার। ফাইনালে ফ্রাইবুর্গকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ৩০ বছর পর প্রথম কোনো বড় ট্রফি জয়ের স্বাদ পায় ভিলা।
ম্যাচ শেষে ইএসপিএন-কে মার্তিনেজ বলেন, ‘আজ (বুধবার) রাতে আমরা যা অর্জন করেছি তা এককথায় অসাধারণ। আমি সত্যিই গর্বিত এবং প্রতিটি ম্যাচের সাথে সাথে আমার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়ছে। আজ ওয়ার্ম-আপের সময় আমার আঙুলটি ভেঙে যায়। এর আগে কখনো আমার আঙুল ভাঙেনি। যতবারই আমি বল ধরতে যাচ্ছিলাম, আঙুলটি উল্টো দিকে মচকে যাচ্ছিল। কিন্তু দিনশেষে, সাফল্যের জন্য এমন কিছু পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আপনাকে যেতেই হবে।‘
ম্যাচের প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই ইউরি তিলেমানস, এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়া এবং মরগান রজার্সের চমৎকার তিনটি গোলে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ভিলা। আর পোস্টের নিচে মার্তিনেজ অতন্দ্র প্রহরী হয়ে থাকায় ফ্রাইবুর্গের ম্যাচে ফেরার আর কোনো সুযোগই ছিল না।
ক্লাবের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়ে মার্তিনেজ বলেন, ‘সত্যি বলতে, এই ক্লাবের সমর্থক এবং এখানকার সবাই আমার পরিবারের মতো। যতবারই অ্যাস্টন ভিলার গোলপোস্ট সামলাতে মাঠে নামি, বুকভরা গর্ব নিয়ে নামি। আজ সবটুকু অভিজ্ঞতা ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। পর্দার আড়ালে যে কঠোর পরিশ্রম আর অনুশীলন আমরা করি, আজ রাতে তারই ফল পেয়েছি।‘
ম্যাচ শেষে নিজের চোট নিয়ে হাসিমুখেই কথা বলেন মার্তিনেজ। ফলে জুনে শুরু হতে যাওয়া আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনে তাঁর অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই বললেই চলে।
ভিলার এই গোলকিপার জানান, ‘আমি ভীষণ আনন্দিত। এখন দলের সবার সাথে উদযাপনের সময়। কারণ, এই ক্লাবটি দীর্ঘদিন ধরে এমন উপলক্ষ পায়নি। এরপরই আমার পুরো মনোযোগ চলে যাবে বিশ্বকাপের দিকে।‘
১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে ‘জে’ গ্রুপে আর্জেন্টিনা। ১৭ জুন শিরোপা ধরে রাখার মিশনে আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামবে তারা। এরপর ২২ জুন অস্ট্রিয়া ও ২৮ জুন জর্ডানের বিপক্ষে খেলবে আলবিসেলেস্তেরা।

সৌদি প্রো লিগের ভাগ্য নির্ধারণ হতে যাচ্ছে আজ। লিগের শিরোপা নির্ধারণী শেষ দিনে দামাক এফসিকে আতিথ্য দেবে আল নাসর। এই ম্যাচের ওপরই নির্ভর করছে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর আল নাসরের দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়া না হওয়া। আজকে জিতলেই দীর্ঘ পাঁচ বছরের ট্রফি খরা ঘুচবে সিআরসেভেনের।
২০২৩ সালে ইউরোপ ছেড়ে সৌদিতে পাড়ি জমান রোনালদো। এরপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে তিন বছর। রিয়াদভিত্তিক ক্লাবটিতে বারবার শিরোপার খুব কাছে গিয়েও ট্রফি ছোঁয়া হয়নি পর্তুগিজ তারকার। সবশেষ যুভেন্তাসের হয়ে ২০২১ সালে ক্লাব পর্যায়ে অফিশিয়াল শিরোপা জিতেছিলেন রোনালদো।
গত সপ্তাহেই শিরোপা জয়ের খুব কাছে গিয়েছিল আল নাসর। আল হিলালের বিপক্ষে ম্যাচে শেষ মুহূর্তের গোলে ড্র করে লিগ শিরোপা নিশ্চিতের সুযোগ হাতছাড়া করে তারা। এরপর শনিবার জাপানি ক্লাব গাম্বা ওসাকার কাছে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগ ২-এর ফাইনালে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় আল নাসরের।
৩৩ ম্যাচে ৮৩ পয়েন্ট নিয়ে সৌদি প্রো লিগের শীর্ষে আল নাসর। সমান ম্যাচে ৮১ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে আল হিলাল। লিগ শিরোপা জয়ের চাবিকাঠি তাই এখনও রয়েছে রোনালদোদের হাতেই। আজ দামাকের বিপক্ষে একটি জয়ই আল নাসরকে ক্লাবের ইতিহাসে ১১ বারের মতো চ্যাম্পিয়নের মুকুট এনে দেবে।
চলতি মৌসুমে আল নাসরে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৮ গোল করেছেন রোনালদো। তবে তাঁর সবশেষ দুই ম্যাচের পারফরম্যান্স ভাবাচ্ছে আল নাসরকে। দুই ম্যাচের একটিতেও জালের দেখা পাননি পর্তুগিজ তারকা।
পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার টিকিট নিশ্চিত করা রোনালদোর চোখ এখন কেবলই দামাক ম্যাচের দিকে। তবে আল নাসরের জন্য কাজটা সহজ হবে না।
দামাক নিজেরাও রেলিগেশন এড়ানোর মরণপণ লড়াইয়ে নামবে। বর্তমানে রেলিগেশন জোন থেকে মাত্র ২ পয়েন্ট ওপরে থাকা দামাকের জন্য লিগে টিকে থাকতে আজ অন্তত ১টি পয়েন্ট প্রয়োজন।
পরিসংখ্যান অবশ্য আল নাসরের পক্ষেই কথা বলছে। নিজেদের মাঠে লিগে টানা ৯ ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে তারা। এছাড়া দামাকের বিপক্ষে শেষ ৯ দেখাতেই জিতেছে আল নাসর।
সবশেষ ২০১৮-১৯ মৌসুমে লিগ শিরোপা জিতেছিল আল নাসর। আল হিলালের সঙ্গে হেড-টু-হেড রেকর্ডে পিছিয়ে থাকায় আল নাসর ভালো করেই জানে—আজ ড্র বা হারলে শিরোপা চলে যেতে পারে আল হিলালের ঘরে। তাই ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে আজ জয়ের কোনো বিকল্প নেই রোনালদোর দলের সামনে।
কয়েক সপ্তাহ আগে রোনালদো প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি এই ক্লাবটিকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে এখানে এসেছি।‘ এখন দেখার বিষয়, আজই কি সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, নাকি দীর্ঘ প্রতীক্ষা আরও দীর্ঘ হবে।
আল নাসর ও দামাক এফসির ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ১২ টায়। একই সময়ে লড়বে করিম বেনজেমার আল হিলাল ও আল ফায়হা এফসি।