৬ মে ২০২৬, ৩:২৭ পিএম

১৯৯৯ সালের সেই অভিশপ্ত রাত। সান সিরোর গ্যালারি তখন স্তব্ধ। ফুটবল বিশ্ব বিস্ময়ে দেখল, যার পায়ে বল থাকলে মনে হতো সৃষ্টিকর্তা কোনো জাদুকরকে পাঠিয়েছেন, সেই রোনালদো নাজারিও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। হাঁটুর মালাইচাকিটা যেন ভেতর থেকে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা মাথা নেড়েছিলেন, সমর্থকরা চোখের জল মুছেছিলেন—সবাই ধরে নিয়েছিলেন, ‘দ্য ফেনোমেননের’ সূর্য বোধহয় সময়ের আগেই অস্তমিত হলো।
পরের গল্পটা ছিল আরও ভয়াবহ। দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে মাঠে ফেরার পর আবারও চোটের কবলে পড়েন রোনালদো। তাঁর ফিজিওথেরাপিস্ট নিলটন পেট্রোনের ভাষায়, ‘যখন সে ফিরল, তার হাঁটুর টেন্ডন পুরোপুরি ছিঁড়ে গিয়েছিল। হাঁটুর হাড়টি যেন বিস্ফোরিত হয়ে উরুর মাঝখানে চলে এসেছিল।’
টানা আড়াই বছর মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছিল এই কিংবদন্তিকে। এমনকি তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে বলেও অনেকে ধরে নিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন
| আল্পসের বুকে গোলের সুনামি, অবিশ্বাস্য ১৯৫৪ বিশ্বকাপ এখনো অমর |
|
আড়াই বছর রোনালদোর কাছে ছিল এক অন্ধকার সুরঙ্গ। মাঠের সবুজ ঘাসের বদলে তাঁর দিন কাটত হাসপাতালের সাদা দেয়ালে আর ফিজিওথেরাপির যন্ত্রণাদায়ক টেবিলে। ফুটবল যখন তাঁকে ছাড়া এগিয়ে যাচ্ছিল, ব্রাজিল দল তখন ধুঁকছিল। বাছাইপর্ব পার হতেই কালঘাম ছুটে যাচ্ছিল সেলেসাওদের। গোল করার লোক নেই, জেতানোর মতো সেই জাদুকরী ছন্দ নেই।
২০০২ বিশ্বকাপের আর মাত্র ৪০ দিন বাকি। কোচ লুই ফিলিপ স্কোলারি যখন দল ঘোষণা করলেন, সারা ব্রাজিল স্তম্ভিত। দলে এমন একজনের নাম, যিনি গত আড়াই বছরে ঠিকমতো ৯০ মিনিট দৌড়াতে পারেননি। ইন্টার মিলানের বেঞ্চে বসে থাকা এক ‘অচল’ খেলোয়াড়কে কেন বিশ্বকাপে নেওয়া হলো? সাংবাদিকদের তোপের মুখে স্কোলারি শুধু একবার তাকালেছিলেন, তাঁর চোখে ছিল জেদ। ভরাট কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি পাগল! তাই ওকে নিয়েছি।’
রোনালদোর তখনো ইন্টার মিলানের হয়ে নিয়মিত খেলতে শুরু করেননি। এমনকি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে যুগোস্লাভিয়া ও পর্তুগালের বিপক্ষে মাত্র ৪৫ মিনিটের ঝাপসা উপস্থিতিও সমর্থকদের আশ্বস্ত করতে পারেনি।
কিন্তু স্কোলারির সেই ‘পাগলামির’ উত্তর দিতে রোনালদো বেছে নিলেন কোরিয়া-জাপানের মাঠকে। প্রথম ম্যাচ থেকেই বোঝা গেল, চোট তার হাঁটু কেড়ে নিলেও তার ভেতরকার আগুন নেভাতে পারেনি। প্রতিটা ম্যাচে তিনি যখন দৌড়াতেন, মনে হতো যেন কোনো ফিনিক্স পাখি ভস্ম থেকে ডানা ঝাপটে আকাশে উড়ছে। যে ডিফেন্ডাররা তাকে আটকানোর ছক কষতেন, তারা শুধু রোনালদোর ছায়াটাই ধরতে পারতেন।
প্রতি ৬৯ মিনিটে একটি গোল—এ যেন কোনো ফুটবলারের পরিসংখ্যান নয়, বরং এক অতিমানবের পুনর্জন্ম। ফাইনালের সেই রাত, প্রতিপক্ষ শক্তিশালী জার্মানি আর দুর্ভেদ্য অলিভার কান। কিন্তু রোনালদো সেদিন ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। জোড়া গোল করে যখন তিনি স্টেডিয়ামের কোণায় দৌড়ে গিয়ে উদযাপন করছিলেন, তখন আর কেউ তাকে ‘অচল’ বলার সাহস পায়নি।
আড়াই বছরের অন্ধকার, অগণিত অস্ত্রোপচার আর মানুষের অবজ্ঞা—সবকিছুকে পায়ের জাদুতে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে রোনালদো সেদিন সোনালী ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরেছিলেন। স্কোলারির সেই তথাকথিত ‘পাগলামি’ সেদিন ফুটবলের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ কাব্য হয়ে লেখা হয়ে গেল। সেটা যে মাস্টারস্ট্রোক ছিল, তা বোঝা গেল এশিয়ায় বিশ্বকাপ শুরু হতেই। আড়াই বছরের চোট কাটিয়ে আসা রোনালদো মাঠে নামলেন ক্ষুধার্ত বাঘের মতো। ২০০২ বিশ্বকাপে প্রতি ৬৯ মিনিটে একটি করে গোল করেছিলেন তিনি।
পুরো টুর্নামেন্টে মোট ৮টি গোল করে ব্রাজিলকে পঞ্চম শিরোপা জিতিয়েছিলেন রোনালদো। যার মধ্যে জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে করা সেই ঐতিহাসিক জোড়া গোলও ছিল। ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে ফুটবল সম্রাট হয়ে ফেরার সেই গল্প আজও ফুটবল প্রেমীদের রোমাঞ্চিত করে।
২০২৬ বিশ্বকাপের আগে রোনালদোর উত্তরসূরী নেইমার জুনিয়রের অবস্থাও একই। বিশ্বকাপের ৩৬ দিন বাকি থাকলেও ব্রাজিল অবশ্য এখনো দল ঘোষণা করেনি। নেইমার থাকবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তা তো আছেই। তবে নেইমারও প্রায় আড়াই বছর জাতীয় দলের বাইরে। তাঁকে নিয়ে কি কার্লো আনচেলত্তি একটা মাস্টারস্ট্রোক খেলবেন? নেইমারও কি পারবেন রোনালদো হয়ে উঠতে? সমর্থকেরা হয়তো সে অপেক্ষা-ই করছেন।
No posts available.